হামে ৮০০ ছাড়াল প্রাণহানি, বর্ষায় ডেঙ্গুর রেকর্ড ঊর্ধ্বগতি
স্বাস্থ্য খাতে দ্বিমুখী সংকট

◉➤ বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য খাতের দুই প্রান্তে এখন চরম উদ্বেগজনক চিত্র। দেশজুড়ে হামের ভয়বহ প্রাদুর্ভাবে প্রাণহানির সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে, যা চলতি বছরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মূল্যায়নে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাদুর্ভাব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যেই বর্ষার মৌসুমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, যেখানে মাত্র ২৩ দিনের ব্যবধানেই ছাড়িয়ে গেছে বিগত ছয় মাসের মোট আক্রান্তের রেকর্ড।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে হামে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০৫ জনে। এর মধ্যে ৭১০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ স্পষ্ট ছিল এবং পরীক্ষাগারে ৯৫ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
আলোচিত এই সময়ে ১ লাখ ২১ হাজার ২০০ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় এবং ১৫ হাজার ৭ জনের ল্যাব শনাক্ত হওয়ায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার ২০৭ জনে পৌঁছেছে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সব রোগীর পরীক্ষা না হওয়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে মৃত্যু হয়েছে ৩০৭ জনের। এছাড়া সিলেটে ১০৬, রাজশাহীতে ৯০, ময়মনসিংহে ৬৭, চট্টগ্রামে ৫৬, বরিশালে ৪৩, খুলনায় ৩১ এবং রংপুরে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪টি হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যা ওই সময়ে বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। সংস্থাটি বাংলাদেশের জাতীয় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিকে ‘উচ্চ’ এবং আঞ্চলিক ঝুঁকিকে ‘মধ্যম’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিগত বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ রোল মডেল থাকলেও, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) বিঘ্ন ঘটায় এই বিপর্যয় নেমে এসেছে।
এ ছাড়া উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির জটিলতায় সময়মতো টিকা সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং ইউনিসেফের বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার বিষয়টিও সংকটকে ঘনীভূত করেছে। লক্ষ্যমাত্রার ঘাটতি এবং ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের সঙ্গে ব্যবধানের কারণে কয়েক লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে যাওয়ায় রোগপ্রতিরোধের এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
চলমান প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং চিকিৎসকদের মতে, টিকা না পাওয়া ও অপুষ্টির শিকার শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও মারাত্মক করে তুলছে।
অন্যদিকে, হামের এই মহামারির মাঝেই বর্ষার তাণ্ডবে নতুন করে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) যেখানে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৯৮ জন, সেখানে কেবল জুলাই মাসের প্রথম ২৩ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৬ জন। ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৫৪ জনে এবং মারা গেছেন দুজন।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মাসে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি বড় অংশই নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলার। এর মধ্যে শুধু সীতাকুণ্ড উপজেলাতেই আক্রান্ত হয়েছেন ৬৪ জন। বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপে নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডেই এডিস মশার উপস্থিতি মেলার পাশাপাশি আটটি ওয়ার্ডকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে উত্তর কাট্টলী, পাহাড়তলী, আলকরণ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ বালুচরা, পাথরঘাটা এবং আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডে এডিস মশার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। সংগৃহীত মশার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই প্রধান বাহক এডিস ইজিপটাই প্রজাতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ও ডেঙ্গুর এই দ্বিমুখী আঘাত মোকাবিলায় দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। একদিকে হামের টিকাদানের আওতা শতভাগে উন্নীত করা এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের চিকিৎসায় বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে জোরালো মশক নিধন কার্যক্রম ও জনসচেতনতামূলক বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম অবিলম্বে মাঠে নামাতে হবে। অন্যথায় জনস্বাস্থ্যের এই সংকট আরও দীর্ঘমেয়াদী ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২৪ জুলাই ২০২৬



