বাংলাদেশLeadফলোআপ

তিন দশক পর প্রথম গ্রেপ্তার, কারাগারে ‘খলনায়ক’ ডন

সালমান শাহ হত্যা মামলা: বিমানবন্দরে ধরা পড়লেন ডন

◉➤ ওমরাহ পালনের উদ্দেশে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি সেরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন ঢালিউডের পরিচিত খলঅভিনেতা মোহাম্মদ আশরাফুল হক ওরফে ডন। কিন্তু ইমিগ্রেশন কাউন্টারে রোববার (০৯ আগস্ট) ভোর ৬টার দিকে বিমানবন্দর পুলিশ তাকে আটকে দেয়। স্টপ লিস্টে নাম থাকায় দেশত্যাগে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল।

২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর হত্যা মামলা করেন, যেখানে সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। সেই মামলায় ডনকে আজ গ্রেপ্তার করা হলো।

বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার জানিয়েছেন, সৌদি আরব যাওয়ার সময় তাকে আটক করা হয় এবং পরে সিআইডির কর্মকর্তারা এসে তাকে নিয়ে যান। সিআইডির ঢাকা মেট্রো পশ্চিমের বিশেষ পুলিশ সুপার গোলাম বেনজীর জানিয়েছেন, ডনকে ইতোমধ্যে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তিন দশক ধরে যে রহস্যের কুয়াশা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে জমে আছে, ডনের এই গ্রেপ্তার সেই মামলায় প্রথম কোনো আসামির আটকের ঘটনা।

চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন চলচ্চিত্রে যিনি পরিচিত ছিলেন সালমান শাহ নামে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের ক্যারিয়ারে সর্বমোট ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, যার অধিকাংশই ছিল বক্স অফিসে সফল। গণমাধ্যম তাকে ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের রাজপুত্র’, ‘আধুনিক ঢালিউডের প্রথম সুপারস্টার’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয়। এই ছবিটি সুপারহিট হয় এবং তাকে রাতারাতি পরিচিতি এনে দেয়।

এরপর একের পর এক হিট ‘তোমাকে চাই’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ প্রতিটি ছবিতে তার উপস্থিতি ছিল দর্শকশালা উপচেপড়ার নিশ্চয়তা। শাবনূরের সঙ্গে তার জুটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে। তারপর হঠাৎ, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সব থেমে যায়।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার ইস্কাটনের নিজ বাসভবনে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হলেও তার মৃত্যু নিয়ে রহস্য থেকে যায়। স্ত্রী সামিরা হক পুলিশকে ঘটনার সংবাদ দেন। সেই প্রথম দিন থেকেই সালমানের পরিবার বিশেষ করে তার মা নীলা চৌধুরী হত্যার অভিযোগ তুলে আসছেন।

নীলা চৌধুরীর অভিযোগ ছিল, তারা হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ সেটিকে অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে। অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেয় আদালত।

১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সিআইডি জানায়, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেন। সিআইডির এই প্রতিবেদনে অসন্তুষ্ট হয়ে সালমানের বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। এরপর বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার কোনো আলামত মিলল না।

এরপর তদন্তের দায়িত্বে আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারাও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় এবং জানায়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ ও জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি।

সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত, পিবিআই তিনটি সংস্থা, তিনটি তদন্ত, তিনটিতেই একই সিদ্ধান্ত। কিন্তু পরিবার মানেনি, ভক্তরা মানেননি, আর বছরের পর বছর ধরে সেই প্রশ্ন সমাজের বুকে জ্বলন্ত থেকেছে।

সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় ২৯ বছর পর নতুন মোড় নিয়েছে এই আলোচিত মামলা। আদালতের নির্দেশে আত্মহত্যা নয়, এবার এটি ‘হত্যা মামলা’ হিসেবে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমানের মা নীলা চৌধুরীর দীর্ঘদিনের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে মামলা চলার নির্দেশ দেন।

মামলার চালিকাশক্তি হলো একটি জবানবন্দি, রেজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের স্বীকারোক্তি। সেই জবানবন্দিতে রেজভী সালমান শাহর হত্যার দায় স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা সালমান শাহকে হত্যা করেছি।’

রেজভীর বিবরণ যা সামনে এসেছে তা চলচ্চিত্রীয় নাটকীয়তাকেও ছাড়িয়ে যায়। রেজভী জানান, ৫ সেপ্টেম্বর রাত আড়াইটায় সালমান শাহর ইস্কাটনের বাসায় যান ডন, ডেভিড, ফারুক ও আজিজ মোহাম্মদ ভাই। ঘটনাস্থলে ছিলেন সালমানের স্ত্রী সামিরা, শাশুড়ি লতিফা হক লুসি এবং আত্মীয়া রুবি।

ঘুমন্ত সালমানকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অচেতন করা হয়। কিছুক্ষণ পর তার জ্ঞান ফিরলে শুরু হয় ধস্তাধস্তি। এক পর্যায়ে আজিজ ইনজেকশন পুশ করার নির্দেশ দেন। রেজভীর দাবি, এরপর ইনজেকশন পুশ করে সালমানকে হত্যা করা হয় এবং ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজাতে সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তার মরদেহ।

রেজভীর অভিযোগ অনুযায়ী এটি ছিল চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ড, যার মূল্য ছিল ১২ লাখ টাকা। হত্যা মামলার এজাহারে ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, শাশুড়ি লতিফা হক লুসি, বিতর্কিত ব্যবসায়ী অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, বাংলা চলচ্চিত্রের খলনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল হক ওরফে ডন।

ডেভিড, জাভেদ ও ফারুক নামের তিনজনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজধানীর বিএফডিসি। এছাড়া ফরিদপুরের রেজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ, রুবি, আ. ছাত্তার ও সাজুকেও আসামি করা হয়েছে।

চলচ্চিত্রে ডন যে ভূমিকায় অভিনয় করেছেন চাণক্য, ষড়যন্ত্রী, আড়ালের কুশীলব জীবন যেন তাকে সেই চরিত্রের আলোয়-ই এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মামলা দায়েরের পর থেকে ডন বেশ কয়েকদিন আড়ালে ছিলেন। ডনের একটি পুরনো সাক্ষাৎকার সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়, যেখানে শাহরিয়ার নাজিম জয় তাকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‌‘সালমান ভাইয়ের আত্মহত্যার কারণ কে হতে পারে?’ সেই সাক্ষাৎকারে তার জবাব এখন নতুন অর্থ বহন করছে।

আদালত গত বছরই সব আসামির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে রিকুইজিশন পাঠিয়ে এজাহারভুক্ত আসামিদের দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সেই সতর্কতাই আজ ভোরে কাজে লাগল।

এজাহারনামীয় আসামিসহ অজ্ঞাত পলাতক আসামিরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজসে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহকে হত্যা করেছে বলে মামলায় অভিযোগ করেন মোহাম্মদ আলমগীর। কিন্তু আইনি লড়াই এখনো শুরুর পর্যায়ে। মূল আসামি সামিরা হক এখনো গ্রেপ্তার হননি। আজিজ মোহাম্মদ ভাই, যার নাম মামলার কেন্দ্রে, তিনিও পুলিশের নাগালের বাইরে।

ডনের গ্রেপ্তার মামলার তদন্তে নতুন গতি আনতে পারে। তবে রেজভীর জবানবন্দি আদালতে প্রমাণ হিসেবে টিকবে কিনা, ২৯ বছর পুরনো ঘটনার সাক্ষ্য-প্রমাণ এখনো কতটা অটুট আছে, সেই প্রশ্নের উত্তর আইনি লড়াইয়ের দীর্ঘ পথে মিলবে।

মৃত্যুর ২৯ বছর পরও সালমান শাহর নাম চিরস্মরণীয় থেকে গেছে, আর তার সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য রহস্যের সত্য উদঘাটনের অপেক্ষায় ছিলেন। আজকের গ্রেপ্তারে সেই অপেক্ষায় নতুন আশার আলো জ্বলল যদিও ন্যায়বিচারের পথ এখনো বহু বাঁক পেরিয়ে যাবে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৯ আগস্ট ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button