
সৌদি আরবের রিয়াদের শিফার মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। এই মৃত্যু একটি সাধারণ দুর্ঘটনা নয়; এটি এক কয়েকটি পরিবার ও জনপদের তিল তিল করে গড়া স্বপ্নকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার এক হৃদয়বিদারক উপাখ্যান।
কী ঘটেছিল?
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া (আল-শিফা মুসা ইন্ডাস্ট্রিয়াল) শিল্প এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় রোববার (৯ আগস্ট) স্থানীয় সময় দুপুর আনুমানিক দুইটার দিকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
কারখানায় সোফা তৈরির কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ—যেমন ফোম, কাপড় ও আঠা থাকার কারণে আগুন মুহূর্তের মধ্যে পুরো কারখানায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুরবেলা যখন এই দুর্ঘটনা ঘটে, তখন কারখানার ভেতরে থাকা কর্মীরা হয় ঘুমাচ্ছিলেন কিংবা বিশ্রামে ছিলেন। পরবর্তীতে রিয়াদের স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে ১৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করেন।
রোববার রাত দেড়টার দিকে (বাংলাদেশ সময়) যখন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়, তখনও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মৃতদের সবাই বাংলাদেশের নাগরিক।
কেন এই ঘটনা এত মর্মান্তিক?
এই দুর্ঘটনা শুধু একটি সাধারণ শিল্প দুর্ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের কয়েকটি নির্দিষ্ট জনপদের ওপর নেমে আসা গভীর এক ট্র্যাজেডি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নিহত ১৬ জন প্রবাসীর বাড়ি নওগাঁ, নাটোর এবং রাজশাহী অঞ্চলের।
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের কলি (৩০), লুৎফর (৩২), মোহন ওরফে জান্ডার, ও রুবেল; বিশা এলাকার সাগর ও মজিদুল; দুবাই এলাকার শুভ ও সুমন; পারকাসুন্দা গ্রামের জালাল এবং উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ শেখসহ ১৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
এর বাইরে নাটোর ও রাজশাহী জেলারও কয়েকজন শ্রমিক এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন। আগুন এত তীব্র ছিল যে নিহতদের মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। ফলে খালি চোখে বা সাধারণ উপায়ে তাদের শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

দূতাবাস ও সরকারি পদক্ষেপ
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস গভীর শোক প্রকাশ করেছে। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার ওয়েলফেয়ার উইংয়ের কাউন্সিলর (শ্রম) মোহাম্মদ রেজায়ে রাব্বিকে উদ্ধৃত করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিত আছেন এবং মৃতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও নাম-ঠিকানা শনাক্ত করতে স্থানীয় সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় রক্ষা করে চলেছেন।
এছাড়া, সৌদি আরবের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
শোকবার্তায় মন্ত্রী বলেন, জীবিকার তাগিদে সুদূর সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের এই অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান অপরিসীম। তিনি নিহতদের মরদেহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
কার দায়, কার ব্যর্থতা?
প্রবাসে বাংলাদেশি শ্রমিকদের এমন করুণ মৃত্যু এবারই প্রথম নয়। প্রশ্ন হলো—একটি সোফা তৈরির কারখানার ভেতরের কর্মপরিবেশ কতটা অনিরাপদ থাকলে দিনের বেলা আকস্মিক আগুনে ১৬টি তাজা প্রাণ এক নিমেষে ঝরে যায়?
ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ: মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি শিল্প কারখানায় অভিবাসী শ্রমিকদের প্রায়শই অপরিসর ও অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গাদাগাদি করে রাখা হয়। সেখানে ফায়ার সেফটি বা জরুরি নিষ্গমন পথ থাকে নামমাত্র কিংবা অনুপস্থিত।
নজরদারির অভাব: নিয়োগকর্তারা অধিক মুনাফার লোভে জীবনরক্ষাকারী ন্যূনতম নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করেন না। অথচ শ্রমবাজারের কূটনীতিতে এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যায়।
যে যুবকেরা পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বুকভরা আশা নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তাদের এভাবে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার বেদনা সমগ্র জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই শোক যেন কেবল আনুষ্ঠানিক সমবেদনা ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, প্রবাসীদের নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কঠোর বার্তা হয়ে ওঠে—এটাই আজ দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের দাবি।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১০ আগস্ট ২০২৬



