
মুসলিম বিশ্বের তিন প্রধান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি—সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান—একটি নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
পবিত্র মক্কা নগরীতে অনুষ্ঠিত এক আকস্মিক শীর্ষ বৈঠকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ঘোষণা করেন।
নৌ ও ভূরাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ক্ষমতার সমীকরণ নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে। চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হলো, এর পারস্পরিক প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো।
ন্যাটোর ঐতিহাসিক ‘আর্টিকেল ৫’-এর আদলে তৈরি এই ব্যবস্থায় বলা হয়েছে—এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে, সেটিকে বাকি দুই দেশের ওপরও সরাসরি আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এর মূল লক্ষ্য হলো বহিরাগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং তিন দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা ও গোয়েন্দা সমন্বয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।
কেন এই আকস্মিক পদক্ষেপ? বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি এই জোট গঠনের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আঞ্চলিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি অবকাঠামো এবং তেল ক্ষেত্রে লাগাতার হামলা রিয়াদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দেয়। দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের একক নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল সৌদি আরব বুঝতে পেরেছে, নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আঞ্চলিক শক্তির বিকল্প নেই।

চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশই তাদের নিজস্ব কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের সুযোগ পাচ্ছে:
-
সৌদি আরব: বিপুল অর্থনৈতিক অবকাঠামো সুরক্ষার বিপরীতে পাকিস্তান ও তুরস্কের কাছ থেকে পাচ্ছে শক্তিশালী সামরিক ও প্রযুক্তিগত ব্যাকআপ।
-
পাকিস্তান: দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে রিয়াদের সুনিশ্চিত আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে তুরস্ক ও সৌদি আরবের জোরালো কূটনৈতিক অবস্থান।
-
তুরস্ক: আঙ্কারার প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য বিশাল নতুন বাজার। যৌথ অস্ত্র ও মিসাইল উৎপাদন এবং বায়রাক্তার ড্রোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তির নতুন ক্রেতা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের উপস্থিতি পাকাপোক্ত করার সুযোগ।
এই চুক্তির তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরান ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশনের জ্যেষ্ঠ সদস্য ইব্রাহিম রেজাই এর তীব্র সমালোচনা করে মন্তব্য করেছেন যে, এ ধরনের চুক্তি রিয়াদকে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা দেবে না।
পাশাপাশি, চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে, ইয়েমেনে হুথিদের সাথে নতুন করে সংঘাত বাঁধলে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ সরাসরি সেনা পাঠাবে কি না, কিংবা ভারতের সাথে পাকিস্তানের সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে রিয়াদ সরাসরি দিল্লির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে কাগজ-কলমের এই চুক্তির আসল শক্তি নিহিত রয়েছে এর ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধ ক্ষমতার মধ্যে। এই তিন দেশ এক ছাতার নিচে আসায় যেকোনো সম্ভাব্য আগ্রাসী শক্তিকে এখন থেকে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বহুগুণ বেশি ভাবতে হবে। ওয়াশিংটন থেকে নতুন দিল্লি—সবার জন্যই এই নতুন সামরিক জোট বর্তমান বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১০ আগস্ট ২০২৬



