
২০০৭ সালের পর গত ১৯ বছরে এত বড় বিপর্যয় দেখেনি জাতি। পাসের হার এক লাফে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে আসা এবং দুই ডজনেরও বেশি জেলার হাজারো শিক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া কোনো সাধারণ হোঁচট নয়।
খাতায় লাল কালির আঁচড় আর বিষণ্ন মুখের ভিড়—এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার ফল কিছু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকটের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
২০০৭ সালের পর গত ১৯ বছরে এত বড় বিপর্যয় দেখেনি জাতি। পাসের হার এক লাফে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে আসা এবং দুই ডজনেরও বেশি জেলার হাজারো শিক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া কোনো সাধারণ হোঁচট নয়।
প্রশ্ন জাগে, এই বিপর্যয় কি দীর্ঘদিনের অবমূল্যায়ন ও অন্ধ পাসের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করাল, নাকি আমাদের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর চরম ব্যর্থতার এক অনিবার্য পরিণতি?
ফলাফলের এই নিম্নমুখী গ্রাফ কেবল শিক্ষার্থীদের মেধার ঘাটতি নির্দেশ করে না, বরং শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষাবোর্ডের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এবার স্কুলের গণ্ডি পেরোনো এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা পাস করা মোট শিক্ষার্থীর ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ।
এই হিসাবে এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট। আর পূর্ণাঙ্গ জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন। গত বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন।
২০২১ সালে দেশে রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করে। ২০০৭ সালের পর চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার সবচেয়ে কম। ওই বছর ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল।
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয় গত ২১ এপ্রিল। গত ২০ মে এসএসসির তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয়। দাখিল এবং এসএসসি ও ভোকেশনালের তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয় ২৪ মে। তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে ফল প্রকাশের দীর্ঘ দিনের রেওয়াজ থাকলেও এবার তা সম্ভব হয়নি।

সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১০টায় একযোগে ফল প্রকাশ করে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সচিবালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে ফলের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট ও মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফলাফল জানতে পারছে। এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক ও সমমানের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়, তাদের মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পাস করেছে। এর মধ্যে নয়টি সাধারণ বোর্ডে ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, মাদ্রাসা বোর্ডে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং কারিগরি বোর্ডে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।
এবারও পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা- দুদিক দিয়েই এগিয়ে আছে মেয়েরা। ছাত্রদের পাসের হার যেখানে ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের মধ্যে ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ পাস করেছে। মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় এবার ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৪ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন।
আর ৯ লাখ ১১ হাজার ৭৯১ জন ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন। আর পূর্ণাঙ্গ জিপিএ, অর্থাৎ পাঁচে পাঁচ পাওয়া ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন ছাত্রী এবং ৫২ হাজার ৭৮০ জন ছাত্র।
যেভাবে মিলবে ফল
সব শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া সমন্বিত ফলাফলের ওয়েবসাইট www.eduboardresults.gov.bd বা https://www.educationboardresults.gov.bd/v2/home থেকে পরীক্ষার্থীরা ফল জানতে পারছে।
পাশাপাশি পরীক্ষার্থীরা মোবাইল ফোনের এসএমএসের মাধ্যমেও ফল জানতে পারবে। যে কোনো অপারেটরের মোবাইল থেকে মেসেজ অপশনে গিয়ে প্রথমে SSC লিখে স্পেস দিয়ে বোর্ডের নামের প্রথম তিন অক্ষর, এরপর রোল নম্বর লিখতে হবে।
এরপর স্পেস দিয়ে 2026 অর্থাৎ পরীক্ষার বছর লিখে ১৬১৪০ নম্বরে এসএমএস পাঠাতে হবে। ফিরতি এসএমএসে পরীক্ষার ফল জানিয়ে দেওয়া হবে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এসএমএসের ফরম্যাট হবে SSC DHA ROLL YEAR।
মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন দাখিল পরীক্ষার্থীদের ফল জানতে SSC MAD ROLL YEAR লিখে ১৬১৪০ নম্বরে পাঠাতে হবে। আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের SSC TEC ROLL YEAR লিখে একই নম্বরে এসএমএস পাঠাতে হবে। প্রতিটি এসএমএসের জন্য ১ টাকা ৩৯ পয়সা চার্জ প্রযোজ্য হবে।

খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন শুরু
সোমবার যেসব পরীক্ষার্থী আশানরূপ ফল পাবেন না, তারা মঙ্গলবার থেকে খাতা পুনর্নিরীক্ষাণের আবেদন করতে পারবেন। ঢাকা বোর্ড এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এবার https://rescrutiny.eduboardresults.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে নির্ধারিত স্থানে রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর পূরণ করতে হবে এবং বোর্ড ড্রপ ডাউন থেকে বোর্ড নির্বাচন করে খাতা পুনর্নিরীক্ষাণের আবেদন করতে হবে শিক্ষার্থীদের।
সেখানে তাদের মোবাইল নম্বর দিতে হবে। পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফল প্রকাশিত হলে ওই নম্বরে এসএমএস পাঠানো হবে। আবেদনের সময় স্ক্রিনে শিক্ষার্থীর বিষয় ভিত্তিক ফলাফল দেখা যাবে। এক বা একাধিক বিষয়ে ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণের জন্য বিষয়গুলো নির্বাচন করে ‘ফি প্রদান করুন’ বাটনে ক্লিক করতে হবে।
প্রতিটি পত্রের জন্য ১৫০ টাকা হারে ফি দিতে হবে পরীক্ষার্থীদের। দ্বিপত্র বিশিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে উভয়পত্রের আবেদন করতে হবে। বিকাশ, নগদ, সোনালী সেবার মাধ্যমে ফি পরিশোধ করা যাবে। ফি পরিশোধ করে আবেদনের পোর্টালে এসে ‘জমা দিন” বাটনে ক্লিক করতে হবে।
ঢাকা বোর্ড জানিয়েছে, ফি দিয়ে একবার আবেদন জমা দেওয়ার পরে আরও বিষয় যুক্ত করতে চাইলে একইভাবে তা করা যাবে। এক্ষেত্রে নতুনভাবে মোবাইল নম্বর দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
এছাড়া ফি পরিশোধের আগেই যদি আবেদন পরিবর্তন বা পরিমার্জনের প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে ‘মুছে ফেলুন’ বাটনে ক্লিক করে নির্বাচিত বিষয়গুলো (যেগুলোর জন্য এখনও ফি প্রদান করা হয়নি) প্রত্যাহার করা যাবে এবং নতুন করে বিষয় নির্বাচন করা যাবে।
তবে একবার ফি জমা দিলে আবেদন করা বিষয়গুলো আর বাতিল করা যাবে না এবং কোনো অবস্থাতেই ফি ফেরত দেওয়া হবে না। হাতে হাতে বা ম্যানুয়ালি শিক্ষা বোর্ডগুলো খাতা পুনর্নিরীক্ষণের কোনো আবেদন নেবে না।
ফলের ভিত্তিতে একাদশে ভর্তি, শূন্য থাকবে পৌনে আট লাখ আসন
চলতি শিক্ষাবর্ষেও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের একাদশ শ্রেণিতে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। আগের মতই কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ এবং এসএসসি ও।সমমান পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর এবং পছন্দক্রমের ভিত্তিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
গতবারের মত এবারও মেধা বা মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনায় একাদশে ভর্তির বিধান রেখে চলতি বছরের একাশনে ভর্তির নীতিমালার খসড়া তৈরি করে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে প্রস্তাব হিসাবে পাঠানো হয়েছে।
তবে রোববার (০৯ আগস্ট) রাত পর্যন্ত চলতি বছরের একাদশের ভর্তি নীতিমালা প্রকাশ করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই নীতিমালায় আবেদনগ্রহণ ও ফল প্রকাশের বিস্তারিত সূচি থাকবে।
উচ্চমাধ্যমিক কলেজ-মাদ্রাসাগুলোতে ফলের ভিত্তিতে ভর্তি কার্যক্রম চললেও নটর ডেম কলেজ, হলিক্রস কলেজের মত চার্চ পরিচালিত কলেজগুলোতে বেশ কয়েকবছর আগে দেওয়া আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ভর্তি পরীক্ষা হবে।
সারা দেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোয় একাদশ শ্রেণিতে আসন রয়েছে ২৬ লাখের বেশি। অন্যদিকে এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি। ফলে বরাবরের মত এবারও একাদশ শ্রেণিতে পৌনে ৮ লাখ আসন ফাঁকা থেকে যাবে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১০ আগস্ট ২০২৬



