Leadবিশ্ব

৫ বছরের গৃহযুদ্ধে লাখো মানুষের মৃত্যু, প্রহসনের নির্বাচনেও কাটছে না সংকট

মিয়ানমার সংকট

◉➤ ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে গত পাঁচ বছরে মিয়ানমারে চলমান রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ এখন এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতে রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘এসিএলইডি’ (ACLED)-এর তথ্য বলছে, বৈশ্বিক সংঘাতের মাত্রায় ফিলিস্তিনের পরই এখন মিয়ানমারের অবস্থান।

সংঘাতের ভয়াবহতা ও পরিসংখ্যান
সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বর্তমানে অন্তত এক হাজার ২০০টিরও বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী লড়াই করছে। এর মধ্যে রয়েছে নবগঠিত পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ) এবং দশকের পর দশক ধরে লড়াই চালিয়ে আসা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগঠনগুলো (ইএও)।

আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা-এসিএলইডি-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থান-পরবর্তী পাঁচ বছরের এই সংঘাতে মোট ১ লাখ ১১৪ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে সামরিক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

স্থলযুদ্ধে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছে ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়া জান্তা বাহিনী এখন ব্যাপকভাবে বিমান হামলার ওপর নির্ভরশীল। প্রায় প্রতিদিনই রাখাইনসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাশিয়া ও চীনের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে নির্বিচারে বোমা হামলা চালানো হচ্ছে। এর প্রধান শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জাতিসংঘের তথ্যমতে, সংঘাতের জেরে দেশের ভেতরেই অন্তত ৩৭ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

রাজনৈতিক চালে প্রহসনের নির্বাচন
ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে জান্তা সরকার সম্প্রতি রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং সামরিক বাহিনী থেকে পদত্যাগ করে ‘বেসামরিক প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে শপথ নেন।

এর আগে একটি সেনা-সমর্থিত রাজনৈতিক দলের বিজয়ের মাধ্যমে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাকে পুরোপুরি ‘প্রহসনমূলক’ আখ্যা দিয়েছেন গণতন্ত্র পর্যবেক্ষকরা। এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল এনএলডি-কে (অং সান সু চির দল) অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া দেশের বিশাল একটি অংশ—যা এখন বিদ্রোহীদের দখলে—সেখানে কোনো ভোটগ্রহণই অনুষ্ঠিত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি ব্যর্থ ও সাজানো উদ্যোগ মাত্র।

ভঙ্গুর অর্থনীতি ও মানবিক বিপর্যয়
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও লাগাতার সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের অর্থনীতি পুরোপুরি খাদের কিনারায় গিয়ে ঠেকেছে। দেশের প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন বর্তমানে চরম খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে ভুগছেন।

বিদেশি বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে। কর্মসংস্থানের অভাবে দারিদ্র্যের হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। সামরিক বাহিনীতে তরুণদের বাধ্যতামূলক যোগদানের ডিক্রি জারির পর যুবসমাজের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ সরাসরি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মত
সংঘাত পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংকট শুধু একটি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ নয়, বরং মিয়ানমারের রাষ্ট্রকাঠামোর সম্পূর্ণ পতন। এসিএলইডি-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সান মন থান্ত বলেন, “এটি মারাত্মক এবং বেসামরিক মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। সংঘাত এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।”

বিশ্লেষকরা মনে করেন, মিন অং হ্লাইংয়ের তথাকথিত বেসামরিক সরকারকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হলে তা কেবল সংকটকেই দীর্ঘায়িত করবে। জান্তাকে থামাতে হলে অস্ত্র ও বিমান জ্বালানি সরবরাহের ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও সামরিক ঐকমত্যের বিকল্প নেই।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২৪ জুলাই ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button