Leadবিশ্ব

তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, হরমুজ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা

ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় মার্কিন হামলা বাড়ছে, পাল্টা আঘাত তেহরানের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত সপ্তম দিনে গড়িয়েছে। আরও তীব্ওের হচ্ছে সংঘাত।  শনিবার (১৮ জুলাই) ভোর পর্যন্ত উভয় পক্ষই নতুন করে হামলা চালিয়েছে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে এএফপি ও রয়টার্স।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, টানা সপ্তম রাতের অভিযানে (ïµevi) তারা ইরানের নজরদারি স্থাপনা, সামরিক রসদ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার এবং সামুদ্রিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

সেন্টকমের দাবি, এ অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, যুদ্ধজাহাজসহ বিভিন্ন সামরিক সম্পদ ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। অন্যদিকে ইরান শনিবার নতুন করে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে।

দেশটির সেনাবাহিনীর ভাষ্য, কুয়েতের আল-আদিরি শিবির ও আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি, জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটির জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহৃত একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তু’ প্রতিহত করায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। জর্ডান জানিয়েছে, তারা ১০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে, তবে এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

বাহরাইনেও বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হয়। এর আগে বাহরাইন ও কাতার উভয় দেশই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবি করেছিল। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নিয়েছে দুই পক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ কার্যকর করছে। এসময় চারটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন, একটি জাহাজ অচল এবং আরেকটিতে ওঠার কথা জানিয়েছে মার্কিন বাহিনী।

অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তাদের নৌ চলাচলের নিয়ম লঙ্ঘন করায় চারটি জাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযানের মাধ্যমে থামানো হয়েছে।

এ ছাড়া আইআরজিসি দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে মাইন পেতে রাখা পথে চলাচল করার সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকার বিস্ফোরণে পুড়ে যায়। তবে সেন্টকম এ দাবিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরজিসির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসন’ অব্যাহত থাকলে এই অঞ্চল থেকে রাসায়নিক সার তো দূরের কথা, ‘এক ফোঁটা তেল বা গ্যাসও’ রপ্তানি হবে না।

ইরানে হতাহত ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ জানিয়েছে, হরমুজগান প্রদেশে মার্কিন হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। দুটি সেতু ও একটি সড়ক সুড়ঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় জাস্ক শহরে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনায় হামলার পর আশপাশের কয়েকটি গ্রামের পানীয়জল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে ইরানি গণমাধ্যম। এ ছাড়া ইয়াজদ, আহভাজ, সিরিক, খোররমাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।

শুক্রবার ইরানি গণমাধ্যম জানায়, দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন হামলায় অন্তত পাঁচটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্দর খামির এলাকায় সেতুতে হামলায় সাতজন নিহত হন। সেখানে একটি রেলস্টেশনেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। পাকিস্তান সীমান্তবর্তী ইরানশাহর শহরের একটি বিমানবন্দরেও হামলা হয়েছে বলে জানানো হয়।

ইরানের হুঁশিয়ারি, জাতিসংঘের উদ্বেগ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা অব্যাহত রাখলে তেহরান আবারও ‘পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান’ শুরু করবে। তার ভাষ্য, ইরান আর ‘যেমন কর্ম তেমন প্রতিক্রিয়া’-তে সীমাবদ্ধ থাকবে না এবং কোনো রাজনৈতিক সীমান্তই নিরাপদ থাকবে না।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইরান ও অঞ্চলজুড়ে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মুখপাত্রের ভাষ্য, এ ধরনের হামলা ‘গ্রহণযোগ্য নয়’।

তেলের দাম আরও বেড়েছে 

এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে কার্যত চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বেড়েছে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বন্ধ হওয়ার সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৮ ডলারের বেশি ছিল, যা এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ ও লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আর্থিক বাজারে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।

নিউজ নাউ বাংলা/ কেএ/ জেডআরসি/ ১৮ জুলাই ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button