
গত এক দশকের বড় অংশজুড়ে বাংলাদেশে হাম টিকার আওতা ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার ওপরে। দেশটি পৌঁছে গিয়েছিল হাম নির্মূলের দোরগোড়ায়। অথচ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়ার পর মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে সেই সাফল্য উল্টে গেছে। এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় চলমান হাম প্রাদুর্ভাবের দেশ বাংলাদেশ; হাম ও সদৃশ উপসর্গে মৃত্যু এক হাজার ছাড়িয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত রয়টার্সের বিস্তারিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই পরিস্থিতির পেছনে টিকাদানের ঘাটতি, টিকা সরবরাহে বিঘ্ন, দুর্বল কর্মসূচি তদারকি এবং হাসপাতালগুলোর সীমাবদ্ধতার চিত্র উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের হালনাগাদ তালিকায়ও বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি হাম রোগীর দেশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তালিকাটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানানো জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি।
রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে হাম-সংশ্লিষ্ট সন্দেহজনক ও নিশ্চিত মৃত্যু ছিল ৯৯৯। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুধবারের বুলেটিনে আরও তিনটি সন্দেহজনক মৃত্যু যুক্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২। এর মধ্যে ৯০২টি সন্দেহজনক এবং ১০০টি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু।
১৫ মার্চ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০ জন সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছেন; পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে ১৯ হাজার ৯০৪ জনের। সন্দেহজনক রোগীদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৩ জনকে এবং ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ৮১৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টাতেই নতুন করে ১ হাজার ১১৯ জন সন্দেহজনক এবং ৬৯ জন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

ফাঁক কোথায়
রয়টার্সকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত এবং সরবরাহ সংকট বিপুলসংখ্যক শিশুকে সুরক্ষার বাইরে ঠেলে দেয়। বিশেষত নয় মাসের কম বয়সি শিশুরা নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমিত হয়েছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে মোট রোগীর প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সোমবার সংসদে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত এবং ২০২৫ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় আরও শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফও নিয়মিত টিকাদানের সূচিতে ব্যাঘাতের কথা জানিয়েছে।
রোগতত্ত্ববিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, ওই দুই বছরের টিকাঘাটতির কারণেই বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তিনি বলেন, দেশে এর আগে এক বছরে এত রোগী কিংবা এত শিশুর মৃত্যুর ঘটনা দেখা যায়নি।
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও কেন থামছে না হাম
প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর এপ্রিল থেকে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান শুরু হয়। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন। সর্বশেষ হিসাবে টিকা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪৬ হাজার ৭৭৩ জনকে—প্রশাসনিক লক্ষ্যমাত্রার ১০৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
কিন্তু এই মোট হিসাব থেকে প্রতিটি জেলা, বয়সগোষ্ঠী ও জনগোষ্ঠীতে দুই ডোজের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা বোঝা যায় না। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা হলো, জরুরি কর্মসূচি নিয়মিত টিকাদানের বিকল্প নয়। আগে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বিশেষ ‘ক্যাচ-আপ’ টিকা দেওয়া এবং দুই ডোজ নিশ্চিত না করলে প্রতিরোধক্ষমতার ফাঁক থেকে যাবে।

হাম এতটাই সংক্রামক যে টিকাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী থাকলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুধু জাতীয় গড় নয়, প্রতিটি এলাকা ও জনগোষ্ঠীতে দুই ডোজের অন্তত ৯৫ শতাংশ টেকসই আওতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেয়।
হাসপাতালে দ্বৈত চাপ
হাম যখন ছড়াচ্ছে, একই সময়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। চলতি বছরে ৪৫ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে নয়জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৫৭১ জনের ভর্তি—দুটিই ছিল বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক সংখ্যা।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীর জন্য শয্যা রয়েছে ৬০টি। ভারপ্রাপ্ত পরিচালক নন্দদুলাল সাহা রয়টার্সকে জানান, অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ১ হাজার ৩৫০ রোগীর ধারণক্ষমতার হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রোগী ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি। শিশুদের প্রয়োজনীয় স্যালাইনের সংকটও পরিস্থিতি জটিল করেছে।
গৃহকর্মী নাসিমা বেগমের ১৩ মাস বয়সি ছেলেকে শয্যার জন্য চারটি হাসপাতালে ঘুরতে হয়েছে। অসুস্থতার কারণে নির্ধারিত সময়ে টিকা নিতে না পারা শিশুটিকে পরে কেন্দ্রে নিয়েও টিকা পাওয়া যায়নি। ১০ দিন হাসপাতালে থাকার পর বাড়ি ফিরলেও তার জ্বর এখনো ফিরে আসছে।
এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করে টিকা দেওয়া, নিয়মিত কর্মসূচির সরবরাহ নিশ্চিত করা, এলাকাভিত্তিক নজরদারি বাড়ানো এবং হাসপাতালে শিশুদের শয্যা ও চিকিৎসা উপকরণ বাড়ানো। প্রাপ্ত তথ্য টিকা অকার্যকর হয়ে যাওয়ার দিকে নয়; বরং কার্যকর টিকা শিশুদের কাছে সময়মতো ও ধারাবাহিকভাবে পৌঁছাতে না পারার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬



