Leadভূরাজনীতি

ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের তিন সংকট, কী হারাল বাংলাদেশ

সুযোগ হারাল বাংলাদেশ, কিন্তু কৌশল শেষ হয়নি

জোটের ভেতরের বিভাজন, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকস। ভারতকে একই টেবিলে চীন, রাশিয়া, ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের হিসাব সামলাতে হচ্ছে। আর এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চে বাংলাদেশ থাকছে না। ঢাকার সিদ্ধান্ত কি কৌশলগতভাবে লাভজনক, নাকি একটি সম্ভাবনাময় বহুপক্ষীয় সুযোগ হাতছাড়া হলো?

নয়াদিল্লি এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম ব্যস্ত কূটনৈতিক মঞ্চ। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানীতে বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা এতে অংশ নিচ্ছেন। সম্মেলনকে ঘিরে দিল্লিতে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

কিন্তু এবারের সম্মেলন শুধু আরেকটি বহুপক্ষীয় বৈঠক নয়। এর পেছনে রয়েছে একাধিক পরস্পরবিরোধী কূটনৈতিক সমীকরণ। ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের অভিঘাত জ্বালানি ও বাণিজ্যপথে ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা তীব্র। একই সময়ে ব্রিকস নিজেও সম্প্রসারণের পর নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।

ভারতের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো, এই সব সমীকরণের মাঝখানে নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখা। আর বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি অন্য রকম। ঢাকা কেন গেল না, গেলে কী পেতে পারত এবং না যাওয়ার সিদ্ধান্তে কী লাভ-ক্ষতি হলো?

ভারতের সামনে তিন বড় সংকট
ব্রিকসের সম্প্রসারণ জোটটিকে আগের তুলনায় অনেক বড় করেছে। বর্তমানে ১১টি সদস্যদেশের এই জোট বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে। ২০২৪-২৫ সালে নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ১০টি পার্টনার দেশও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঐকমত্যের প্রশ্নটিও কঠিন হয়েছে।

প্রথম সংকট: পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ
ইরান এখন ব্রিকসের সদস্য। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতও জোটের সদস্য। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে তাদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক হিসাব এক নয়। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ভারত আবার ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও আরব বিশ্বের সঙ্গে একই সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

ফলে ইরানকে ঘিরে কোনো কঠোর যৌথ অবস্থান নেওয়া ব্রিকসের জন্য সহজ নয়। চলমান যুদ্ধ ইতিমধ্যে জোটটির ঐক্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও তেলের বাজারে অস্থিরতা ব্রিকসের অর্থনৈতিক আলোচনাকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে।

image-313714-1789104383.webp

দ্বিতীয় সংকট: চীন-রাশিয়া বনাম ভারতের ভারসাম্য
ভারতের জন্য ব্রিকসের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বাস্তবতা হলো একই টেবিলে বসতে হচ্ছে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে। রাশিয়া ভারতের পুরোনো প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি অংশীদার। ইউক্রেন যুদ্ধের পরও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি দিল্লি। অন্যদিকে চীন ভারতের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী।

২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তা কিছুটা কমেছে। ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠক তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সীমান্ত, বাণিজ্য ঘাটতি, বাজারে প্রবেশাধিকার, বিনিয়োগ ও দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারত একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর করছে। সুতরাং দিল্লির কাছে ব্রিকস কোনো পশ্চিমাবিরোধী সামরিক বা রাজনৈতিক জোটে পরিণত হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের লক্ষ্য বরং ব্রিকসকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা, যেখানে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করা যাবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট হবে না। এটাই ভারতের ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’র মূল পরীক্ষা।

তৃতীয় সংকট: ডলারের বিকল্প কি সম্ভব?
ব্রিকসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক আলোচনা হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো। সদস্য দেশগুলো স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং বিকল্প অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এই আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে।

কিন্তু এখানে বাস্তব সীমাবদ্ধতা আছে। ব্রিকসের সদস্যদের অর্থনীতি, মুদ্রা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আর্থিক নীতি এক নয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যে ডলারের গভীর অবস্থানও একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই ডলারের বিকল্প একটি একক মুদ্রা তৈরি করার চেয়ে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, অর্থপ্রদানের বিকল্প ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন অর্থায়ন বাড়ানোই বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।

এখানেই ব্রিকসের New Development Bank, বাণিজ্য ও অর্থপ্রদানের সহযোগিতা এবং নতুন সরবরাহ-শৃঙ্খলা তৈরির আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। এবারের সম্মেলনে স্টার্টআপ ফান্ড, ব্রিকস ইনকিউবেটর নেটওয়ার্ক এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলা সহযোগিতার মতো উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

এই বিভক্ত ব্রিকসেই ভারতের সুযোগ
ব্রিকসের ভেতরে মতপার্থক্য থাকলেও জোটটির গুরুত্ব কমে যায়নি। বরং সম্প্রসারণের ফলে এর কূটনৈতিক পরিসর বেড়েছে। ভারত এই প্ল্যাটফর্মে একই সঙ্গে তিন ধরনের কাজ করতে পারে। প্রথমত, চীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার সঙ্গে পুরোনো কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রাখতে পারে। তৃতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে নিজের নেতৃত্বের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। ভারত তাই ব্রিকসকে পশ্চিমের বিকল্প হিসেবে দেখলেও সরাসরি পশ্চিমাবিরোধী জোট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। এখানেই দিল্লির কূটনীতির জটিলতা।

1789106995-c6f316e87f894cef91074cbb91a81522.webp

বাংলাদেশের অনুপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়। তবে ২০২৪ সালের কাজান সম্মেলনে ব্রিকসের ‘পার্টনার কান্ট্রি’ কাঠামো তৈরি করা হয় এবং বাংলাদেশকে সম্ভাব্য পার্টনার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। বাংলাদেশ অবশ্য বর্তমান ১০ পার্টনার দেশের তালিকায় নেই।

এবার ভারত বাংলাদেশকে শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে আমন্ত্রণ জানায়। ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, আমন্ত্রণটি দেওয়া হয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে BIMSTEC-এর বর্তমান চেয়ার হিসেবে। বাংলাদেশের সরকার পরে এই আমন্ত্রণের ধরন নিয়ে আপত্তি জানায়।

১০ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বা বাংলাদেশের অন্য কোনো সরকারি প্রতিনিধি ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল BIMSTEC-এর চেয়ারকে। একই সঙ্গে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর বহুপক্ষীয় সম্মেলনের মাধ্যমে নয়, দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ অবশ্য সিদ্ধান্তটির পেছনে ‘নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির’ কথা বলেছেন, যদিও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। অর্থাৎ বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে শুধু ‘ব্রিকস বর্জন’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ হবে। এটি আসলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান অবস্থারও একটি বার্তা।

বাংলাদেশ গেলে কী লাভ হতে পারত? এখানে বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ ছিল তিন স্তরে।

এক. একসঙ্গে বহু শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ
একটি আউটরিচ সেশনে ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতো।

বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের অর্থনীতি এখন বাণিজ্য, জ্বালানি, রপ্তানি বাজার, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সহযোগিতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। একটি বহুপক্ষীয় মঞ্চে একসঙ্গে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ তৈরি করার সুযোগ সাধারণত পাওয়া যায় না।

দুই. ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন সূচনা
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর যদি ব্রিকসের মতো একটি বহুপক্ষীয় মঞ্চে হতো, তাহলে সেটি দুই দেশের সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ ছিল।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বাইরে আন্তর্জাতিক নেতাদের সামনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন রাজনৈতিক বার্তাও দেওয়া যেত। বিশেষ করে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোতে ভবিষ্যৎ আলোচনার পরিবেশ তৈরি হতে পারত।

60ec5a85-f4f8-444c-aee8-c43856619a58.webp

তিন. BIMSTEC-এর চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশ বর্তমানে BIMSTEC-এর চেয়ার। ফলে আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়া শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বঙ্গোপসাগরীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতিনিধিত্বের সুযোগও তৈরি করত।

BIMSTEC-এর সঙ্গে ব্রিকসের সংযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশ নিজেকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী একটি আঞ্চলিক সেতু হিসেবে তুলে ধরতে পারত। এটি বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিকভাবে মূল্যবান হতে পারত।

তাহলে, না গিয়ে বাংলাদেশের লাভ কী? এখানেও সিদ্ধান্তটির যুক্তি আছে।

প্রথমত, ঢাকা মনে করছে আমন্ত্রণের ধরন যথাযথ ছিল না। বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট করেছে, আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে নয়, BIMSTEC-এর চেয়ারকে দেওয়া হয়েছিল। ফলে সেখানে গিয়ে অংশগ্রহণ করলে সেটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের একটি বহুপক্ষীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ হিসেবে উপস্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ঢাকার দৃষ্টিতে এটি রাজনৈতিক মর্যাদা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আলাদা দ্বিপক্ষীয় কাঠামোয় পুনর্গঠন করতে চাইছে। সরকারের বক্তব্য হলো, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর হলে সেটি সরাসরি দুই দেশের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত।

তৃতীয়ত, দিল্লির সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে একটি সুস্পষ্ট দ্বিপক্ষীয় এজেন্ডা তৈরি করে তারপর সফর করলে বাংলাদেশ আলোচনায় বেশি প্রস্তুত অবস্থানে যেতে পারে।

এই যুক্তিটি কূটনৈতিকভাবে অযৌক্তিক নয়। কিন্তু ক্ষতিটাও কম নয়। সমস্যা হলো, কূটনীতিতে একটি দরজা বন্ধ করলে অন্য একটি দরজা সবসময় সঙ্গে সঙ্গে খোলে না। বাংলাদেশ এবার এমন একটি মঞ্চে থাকছে না, যেখানে বিশ্বের বড় অর্থনীতি ও শক্তিগুলোর নেতারা একই সময়ে উপস্থিত থাকবেন।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা রয়েছে। ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।

এই সব দেশের প্রতিনিধিদের একই মঞ্চে পাওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বিরল কূটনৈতিক সুযোগ ছিল। সরাসরি কোনো চুক্তি না হলেও বৈঠক, পরিচিতি, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা এবং ভবিষ্যৎ যোগাযোগের পথ তৈরি হতে পারত।

অন্যদিকে বাংলাদেশ না যাওয়ার ফলে একটি রাজনৈতিক বার্তা গেছে: ঢাকা তার প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরকে বহুপক্ষীয় অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে নয়, পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে দেখতে চায়। এই অবস্থান ভবিষ্যৎ ভারত-বাংলাদেশ আলোচনায় কিছুটা দর-কষাকষির ক্ষমতা দিতে পারে।

নয়াদিল্লিতে-ব্রিকস-সম্মেলন-বাংলাদেশের-সামনে-সুযোগ-ও-চ্যালেঞ্জ-কী-web.jpg-8970bb.jpeg

বাংলাদেশের জন্য আসল হিসাব কোথায়?
বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে ‘সঠিক’ বা ‘ভুল’—এই দুই শব্দে বিচার করলে কূটনৈতিক বাস্তবতা ধরা পড়বে না। মূল প্রশ্ন হলো, ঢাকা কী অর্জন করতে চায়।

যদি প্রধান লক্ষ্য হয় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন, তাহলে একটি আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফর সত্যিই বেশি কার্যকর হতে পারে। সেখানে গঙ্গার পানি, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ভারসাম্য, ট্রানজিট, জ্বালানি, নিরাপত্তা, তিস্তা ও প্রত্যর্পণের মতো দ্বিপক্ষীয় ইস্যু সরাসরি আলোচনায় আনা সম্ভব।

কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় বাংলাদেশের বৈশ্বিক কূটনৈতিক পরিসর বাড়ানো, তাহলে ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে অনুপস্থিত থাকা একটি হারানো সুযোগ। আর এখানেই বাংলাদেশের কূটনীতির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বহুপক্ষীয় সুযোগ যেন হারিয়ে না যায়।

একটি সুযোগ হারাল বাংলাদেশ, কিন্তু কৌশল শেষ হয়নি
ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো বাংলাদেশের সরাসরি অংশগ্রহণের একটি সুযোগ নষ্ট হওয়া। সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য লাভ হলো, ঢাকা ভারতকে বোঝাতে পেরেছে যে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফরকে তারা আলাদা রাজনৈতিক গুরুত্ব দিতে চায়।

এখন সেই সিদ্ধান্তের মূল্য নির্ধারণ করবে পরবর্তী পদক্ষেপ। যদি ঢাকার সঙ্গে দিল্লির একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর হয় এবং সেখানে দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়, তাহলে ব্রিকস সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তকে কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা যাবে।

কিন্তু যদি দ্বিপক্ষীয় সফর দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, কোনো কার্যকর এজেন্ডা তৈরি না হয় এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয়গুলো একই জায়গায় থাকে, তাহলে ব্রিকসের আউটরিচে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি একটি হারানো কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবেই থেকে যাবে।

নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলন মূলত তিনটি প্রশ্নের পরীক্ষা নিচ্ছে—ভারত কি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করেও পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে পারবে? ব্রিকস কি অভ্যন্তরীণ বিভাজন পেরিয়ে কোনো কার্যকর যৌথ অবস্থান নিতে পারবে? আর সম্প্রসারিত এই জোট কি বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করতে পারবে?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও সরল।

ঢাকা কি দ্বিপক্ষীয় মর্যাদা ও রাজনৈতিক বার্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুপক্ষীয় একটি সুযোগ ছেড়ে দিল, নাকি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করানোর জন্য সচেতনভাবে একটি আলাদা পথ বেছে নিল?

এর উত্তর নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসে দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক কোন দিকে যায় তার ওপর। ব্রিকসের দরজা একবার বন্ধ হলে আবার খোলা যায়। কিন্তু কূটনীতিতে সময়, যোগাযোগ ও উপস্থিতির সুযোগ সবসময় একইভাবে ফিরে আসে না।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button