Leadএনএনবি বিশেষবাংলাদেশ

ওমরাহ ভিসায় ‘পালানোর ছক’ ১৭ যাত্রীর, দুই ঝুঁকিতে ‘ইকোট্রিপ’

প্রথম দফায় ফেরেননি চারজন ।। নতুন করে বাড়ছে উদ্বেগ ।। ওমরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রশ্ন

◉ মোস্তাফিজুর রহমান খান | ঢাকা ➤ ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়ে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে দেশে না ফেরার অভিযোগ উঠেছে ১৭ বাংলাদেশি যাত্রীর বিরুদ্ধে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন এবং বাকিরাও দেশটিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে দাবি করেছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত ট্রাভেল এজেন্সি ‘ইকোট্রিপ ট্রাভেলস’।

এ ঘটনায় নিজেদের দায়মুক্তি ও ভবিষ্যৎ আইনি জটিলতা এড়াতে তেজগাঁও মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে, ওমরাহ ভিসার আড়ালে পরিকল্পিতভাবে সৌদি আরবে থেকে যাওয়া কিংবা অবৈধ অভিবাসনের কোনো চক্র কাজ করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

এজেন্সির দাবি সত্য হলে, ১৭ যাত্রীই নির্ধারিত সময়ের পর সৌদি আরবে অবস্থান করলে বড় ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে প্রতিষ্ঠানটি।

১৭ যাত্রীর স্বল্পমেয়াদি ওমরাহ ভিসা
ইকোট্রিপ ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী সুমন ইসলামের করা জিডি এবং এজেন্সি সূত্রে জানা যায়, কারওয়ান বাজারের কাব্যকস সুপার মার্কেটের লিফট-৫-এ প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়। দীর্ঘদিন ধরে হজ, ওমরাহ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণসংক্রান্ত সেবা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। চলতি বছরের ১৪, ১৮, ১৯, ২৩ আগস্ট এবং ৮ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন সময়ে এজেন্সিটির মাধ্যমে ১২ দিন মেয়াদি মোট ১৭টি ওমরাহ ভিসা প্রক্রিয়া করা হয়।

জিডিতে বলা হয়েছে, শরীয়তপুরের জাজিরা থানার হরিআসা গ্রামের আমিনুল হক সিকদারের ছেলে মো. রাব্বী সিকদার ‘আল বারাকাহ’ (AL BARAKAH) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয়ে ইকোট্রিপের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর মাধ্যমেই ১৭টি ওমরাহ ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

এজেন্সির হিসাবে, এ বাবদ রাব্বী সিকদার এনআরবিসি, আইএফআইসি ও ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবের মাধ্যমে মোট ৩ লাখ ৮ হাজার টাকা ইকোট্রিপের ব্যাংক হিসাবে জমা দেন।

প্রথম দফায় ফেরেননি চারজন
জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৫ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রথম দফায় ছয়জন যাত্রী ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে যান। তাঁদের ভিসার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও চারজন দেশে ফেরেননি বলে দাবি করেছে এজেন্সি। পরে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কয়েকজন স্বজন জানান, সংশ্লিষ্টরা আপাতত সৌদি আরবে থাকার পরিকল্পনা করছেন।

এজেন্সির পক্ষ থেকে যাত্রীদের দেওয়া যোগাযোগ নম্বরে খোঁজ নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়। এ সময় চট্টগ্রামের মো. হোসেনের স্ত্রীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তাঁর স্বামী ওমরাহ শেষে সৌদি আরবে থাকা এক আত্মীয়ের কাছে উঠেছেন এবং সেখানে কয়েক মাস থাকার পরিকল্পনা রয়েছে।

সাতকানিয়ার মো. আজিমের ক্ষেত্রে তাঁর বন্ধু সিফাত ফোন ধরেন। তিনি জানান, আজিম সৌদি আরবে গেছেন, তবে তিনি দেশে ফিরবেন কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত নন। অন্য কয়েকজনের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায় বলে এজেন্সি জানিয়েছে।

নতুন করে বাড়ছে উদ্বেগ
ইকোট্রিপের স্বত্বাধিকারী সুমন ইসলাম ১১ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও থানায় জিডি করেন। জিডির নম্বর ৮০৬। জিডি করার সময় তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭ যাত্রীর মধ্যে চারজন সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন এবং ১৩ জন তখনো বাংলাদেশে ছিলেন।

তবে ১২ সেপ্টেম্বর এজেন্সির পক্ষ থেকে নতুন করে খোঁজ নিয়ে দাবি করা হয়েছে, গত এক দিনে আরও কয়েকজন সৌদি আরবে গেছেন। বাকি যাত্রীদেরও সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। এ কারণে এজেন্সির আশঙ্কা, ১২ দিন মেয়াদি ওমরাহ ভিসা ব্যবহার করে ১৭ জনের একটি বড় অংশ কিংবা সবাই সৌদি আরবে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকতে পারেন।

তবে এই যাত্রীদের উদ্দেশ্য কী এবং তাঁরা সত্যিই নির্ধারিত সময়ের পর সৌদি আরবে অবস্থান করবেন কি না—তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। শুধু ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে যাওয়া বা দেশে ফেরার সময় পরিবর্তন করলেই মানবপাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হয় না।

প্রায় ৮৫ লাখ টাকার ঝুঁকির দাবি
ইকোট্রিপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের পর যাত্রীরা সৌদি আরবে থেকে গেলে এজেন্সিকে জনপ্রতি ৫ লাখ ১ হাজার টাকা করে আর্থিক দায়ের মুখে পড়তে হতে পারে। এজেন্সির দেওয়া এই হিসাব অনুযায়ী ১৭ জনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য আর্থিক দায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা।

তবে এই অঙ্কটি এজেন্সির পক্ষ থেকে করা সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব। বাংলাদেশের হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১-এ ওমরাহ এজেন্সির অনিয়মের ক্ষেত্রে তদন্ত ও শুনানি শেষে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা প্রশাসনিক জরিমানা, জামানত বাজেয়াপ্ত, নিবন্ধন স্থগিতসহ বিভিন্ন ব্যবস্থার বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে সৌদি আরবেও ওভারস্টে নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে সৌদি পাবলিক সিকিউরিটি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থানকারী হজ বা ওমরাহযাত্রীদের বিষয়ে সময়মতো কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করলে সংশ্লিষ্ট হজ-ওমরাহ সেবা কোম্পানির সর্বোচ্চ ১ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা হতে পারে এবং একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেই জরিমানা বাড়তে পারে।

পুলিশের তদন্তে মানবপাচার চক্রের সন্দেহ
জিডির বিষয়ে তেজগাঁও থানার ডিউটি অফিসার মো. আনোয়ার হোসেন খান বলেন, অভিযোগটি সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করে বিষয়টি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা ও তেজগাঁও থানার এসআই হিরণ বলেন, অভিযোগটি রাতে নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্মীয় ভিসার আড়ালে কোনো মানবপাচার বা অবৈধ অভিবাসন চক্র কাজ করছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

এর আগেও ওমরাহযাত্রী আটকে পড়ার ঘটনা
ওমরাহযাত্রীদের দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। চলতি বছরের এপ্রিলে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে যাওয়া ৩৩ বাংলাদেশি ওমরাহযাত্রী ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশে ফিরতে পারেননি।

তাঁরা ২৪ মার্চ সৌদি আরব গিয়েছিলেন এবং ৫ এপ্রিল দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু এজেন্সি সময়মতো ফেরার টিকিট দিতে না পারায় তাঁদের প্রত্যাবর্তন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ১৮ এপ্রিল তাঁদের ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। পরে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তাঁদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।

ওই ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—সেখানে যাত্রীদের অভিযোগ ছিল এজেন্সির ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় তাঁরা আটকা পড়েছিলেন। আর ইকোট্রিপের বর্তমান অভিযোগে বলা হচ্ছে, কয়েকজন যাত্রী নিজেরাই দেশে না ফেরার পরিকল্পনা করছেন। ফলে দুই ঘটনাকে একই ধরনের হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ওমরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রশ্ন
বাংলাদেশে ওমরাহযাত্রীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। চলতি ২০২৬ মৌসুমে প্রায় চার লাখ বাংলাদেশি ওমরাহ পালন করেছেন বলে একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে খাতসংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে অনিয়ন্ত্রিত অপারেটর, আর্থিক অনিয়ম ও সেবার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়েছে।

সরকারের হজ ব্যবস্থাপনা পোর্টালেও ২০২৬-২৭ সালের জন্য অনুমোদিত ওমরাহ এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে কোনো এজেন্সির মাধ্যমে ওমরাহ ভিসা নেওয়ার আগে সেটি অনুমোদিত কি না, তা যাচাইয়ের গুরুত্বও রয়েছে।

এদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষও ওমরাহ ভিসায় অবস্থানের মেয়াদ এবং সময়মতো প্রস্থান নিশ্চিত করার বিষয়ে নিয়মিত সতর্ক করে আসছে। ২০২৬ সালের মার্চে সৌদি কর্তৃপক্ষ ওমরাহযাত্রীদের নির্ধারিত সময়ে প্রস্থান এবং আবাসন ও যাত্রার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়।

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button