
◉➤ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ার এই সময়ে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে নীরব এক পরিবর্তন আনছে নব্বইয়ের দশকে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী শস্য ‘ঢেমশি’ বা বাকহুইট (Buckwheat)। ষাটের দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বৃহত্তর পরিসরে বাংলাদেশে এর চাষ হলেও ধীরে ধীরে তা বিলুপ্তির পথে চলে যায়।
তবে আশার কথা হলো, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলায় নতুন করে এই পরিবেশবান্ধব ও পুষ্টিসমৃদ্ধ শস্যটির আবাদ শুরু হয়েছে। উদ্ভিদতাত্ত্বিক দিক দিয়ে গমের সাথে এর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও এবং আবাদের ধরনে সরিষার সাথে মিল থাকলেও, পুষ্টিগুণ ও স্বল্প খরচের কারণে এটি ভাতের একটি চমৎকার বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে।
‘ঢেমশি’ আবাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর সাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্য ও স্বল্প জীবনকাল। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এক কেজি বোরো ধান ফলাতে যেখানে তিন থেকে চার হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়, সেখানে ‘ঢেমশি’ আবাদে সেচের প্রয়োজন প্রায় নেই বললেই চলে।
রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে শুধু পর্যাপ্ত জৈব সার ব্যবহার করেই এর আবাদ সম্ভব। পাশাপাশি, বীজ বপনের মাত্র ৮০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা যায়। ফলে বছরের যে সময়ে জমি পতিত থাকে, সে সময়ে সাথী বা মিশ্র ফসল হিসেবে কৃষকরা অনায়াসেই এর চাষ করতে পারেন।

পুষ্টির দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ঢেমশি’ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সম্পূর্ণ গ্লুটেন-মুক্ত এবং উচ্চ ফাইবারযুক্ত হওয়ায় এটি ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীদের জন্য একটি আদর্শ খাদ্য। প্রতি ১০০ গ্রাম ঢেমশিতে ৩৪৩ কিলোক্যালরি শক্তির পাশাপাশি ৫৫ শতাংশ শর্করা, ২৪ শতাংশ আমিষ এবং ২৬ শতাংশ ডায়াটারি ফাইবার রয়েছে।
এ ছাড়াও এতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় আয়রন, জিংক, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো অত্যাবশ্যকীয় খনিজ উপাদান বিদ্যমান, যা দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা মেটাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
পুষ্টি ও পরিবেশবান্ধব দিকের পাশাপাশি ‘ঢেমশি’ কৃষকের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও বেশ লাভজনক। একর প্রতি এক থেকে দুই টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব, যার বর্তমান বাজারমূল্য টনপ্রতি প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এর বাইরে ঢেমশির ফুল থেকে একরে প্রায় ১২০ কেজি উন্নতমানের মধু আহরণ করা যায়, যা থেকে কৃষকের বাড়তি প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় হতে পারে।
জাপান, রাশিয়া ও ইউরোপের বাজারে ঢেমশির ব্যাপক চাহিদা থাকায় এটি একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ অর্গানিক প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে এর সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
পরীক্ষামূলক আবাদের পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে এবং অন্যান্য জেলাতেও এর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। বিলুপ্তপ্রায় এ ফসলটি পুনরুদ্ধারে মাঠে কাজ করছে বাংলাদেশ অর্গানিক প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম ও তার দল।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১৮ জুলাই ২০২৬



