প্রবাসী ফুটবলার ঘিরে বাড়ছে উন্মাদনা, উঁকি দিচ্ছে নতুন স্বপ্ন

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো প্রবাসী ফুটবলারের ভিডিও বা পরিচয় সামনে এলেই তাঁকে নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। কেউ খেলেছেন ইউরোপের কোনো একাডেমিতে, কেউ কোনো বিদেশি ক্লাবের বয়সভিত্তিক দলে; এসব তথ্য ছড়িয়ে পড়তেই বাংলাদেশ জাতীয় দলে তাঁকে দেখার দাবি ওঠে।
প্রবাসী ফুটবলারদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই হাইপ এখন বেশ পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু মাঠে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন কতটা? সাম্প্রতিক এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশের ব্যর্থতায় প্রশ্নটা জোরালো করে তুলেছে। উজবেকিস্তানে ‘বি’ গ্রুপে তিন ম্যাচ খেলে একটিতেও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। স্বাগতিক উজবেকিস্তান, সিরিয়া ও ভারতের কাছে হেরে কোনো পয়েন্ট ছাড়াই বিদায় নিয়েছে দল।
প্রবাসী ফুটবলার বাছাইয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো প্রভাব নেই বলে দাবি বাফুফের সহসভাপতি ফাহাদ করিমের। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর প্রস্তাব করা খেলোয়াড়দের নাম টেকনিক্যাল টিমের মতামতের ভিত্তিতেই দেওয়া হয়েছে। এমন অনেক খেলোয়াড়ের নামও তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, যাঁদের টেকনিক্যাল টিম পরে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফাহাদ করিম বলেন, ‘আমি যেসব খেলোয়াড়ের নাম প্রস্তাব করেছি, সবই টেকনিক্যাল টিমের মতামতের ভিত্তিতে। এমন অনেক খেলোয়াড়ও আছেন, যাঁদের নাম আমি প্রস্তাব করেছিলাম, কিন্তু টেকনিক্যাল টিম তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী বলা হচ্ছে, সেটিও তিনি দেখেন না বলে দাবি ফাহাদের, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী বলা হচ্ছে, আমি কখনোই তা দেখি না। স্থানীয় কিংবা বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার আমার কাছে কোনো মূল্য নেই।’
ফাহাদ করিম নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথেষ্ট সক্রিয়। প্রবাসী ফুটবলারদের বাংলাদেশে নিয়ে আসার ঘোষণাটা সাধারণত নিজের ফেসবুক পেজে তিনি দিয়ে থাকেন।
হামজা চৌধুরীর পর একে একে বাংলাদেশের জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামছেন বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণরা। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের ফুটবলে তৈরি করছে নতুন সম্ভাবনা।

বাংলাদেশের ফুটবলে একসময় প্রবাসী খেলোয়াড়দের নাম শোনা যেত না বললেই চলে। এখন প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। জামাল ভূঁইয়ার হাত ধরে যে ধারার শুরু, হামজা চৌধুরীর আগমনে সেটি পেয়েছে নতুন গতি। আর সেই ধারাবাহিকতায় সামিদ, ফাহমিদুল ইসলাম, জায়ান আহমেদ ও কিউবা মিচেলের মতো তরুণরা বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করছেন।
সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনের নাম অবশ্যই হামজা চৌধুরী। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অভিজ্ঞ একজন ফুটবলার বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সি পরবেন, একসময় সেটি ছিল সমর্থকদের কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য। এখন সেটাই বাস্তব। তাঁর উপস্থিতি শুধু জাতীয় দলের মাঝমাঠকে সমৃদ্ধ করেনি, প্রবাসী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জন্যও জাতীয় দলের দরজা নতুনভাবে খুলে দিয়েছে।
হামজার পর শমিত সোম
হামজার পর আলোচনায় উঠে আসা অন্যতম নাম শমিত সোম। কানাডায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের বাবা-মা বাংলাদেশি। কানাডার জাতীয় দলের হয়েও খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বর্তমানে কানাডার শীর্ষ লিগের ক্লাব কেভালের হয়ে খেলছেন তিনি।
বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামার পর শমিত সোমের পারফরম্যান্স সমর্থকদের নজর কেড়েছে। দীর্ঘ ভ্রমণ, ভিন্ন পরিবেশ কিংবা জাতীয় দলের সঙ্গে নতুন করে মানিয়ে নেওয়ার চাপ, কোনোটিই তাঁর আগ্রহে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
ফাহমিদুলের গতি
ইতালিপ্রবাসী ফাহমিদুল ইসলামও বাংলাদেশের আক্রমণভাগে ভিন্ন ধরনের বিকল্প তৈরি করছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র গতি ও ড্রিবলিং। মাঠের ডান প্রান্ত দিয়ে তাঁর আক্রমণ অনেক সময় ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
শুধু উইং নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী লেফট ব্যাক কিংবা উইং ব্যাক হিসেবেও খেলতে পারেন তিনি। ফলে একজন খেলোয়াড় হিসেবেই জাতীয় দলের একাধিক কৌশলগত বিকল্প তৈরি হচ্ছে।

জায়ানের বয়স কম, সম্ভাবনা অনেক
ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে ২১ বছর বয়সী জায়ান আহমেদকে ঘিরে প্রত্যাশা বেশি। তাঁর বাবা শরিফ আহমেদ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঢাকার প্রথম বিভাগ ফুটবলে খেলেছেন। বাবার পথ ধরে ফুটবলে আসা জায়ান খেলেন লেফট ব্যাক হিসেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ম্যাশন বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে খেলার পাশাপাশি স্পেন ও ডেনমার্কের বিভিন্ন একাডেমিতে অনুশীলন ও টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২৩ দলে অভিষেকের পর জাতীয় দলের ক্যাম্পেও জায়গা পান জায়ান। হংকংয়ের বিপক্ষে জাতীয় দলের হয়ে বদলি হিসেবে নেমে রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি আক্রমণে উঠে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি।
কিউবার দিকে চোখ
ইংল্যান্ডপ্রবাসী কিউবা মিচেলও বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় নাম। ১৯ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের মা বাংলাদেশি, বাবা জামাইকান। বর্তমানে ইংল্যান্ডের ক্লাব সান্ডারল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-২১ দলে খেলছেন তিনি। কিউবার বিশেষত্ব তাঁর বহুমুখিতা। রক্ষণাত্মক, সেন্ট্রাল কিংবা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ড, তিন ভূমিকাতেই খেলতে পারেন তিনি।
প্রবাসী ফুটবলারদের এই নতুন স্রোত বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ। এর মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছে ভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতি, উন্নত প্রশিক্ষণ কাঠামোর অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার মানসিকতা।
তবে এখানেই অপেক্ষা করছে আসল পরীক্ষা। প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের দলে নেওয়ার পর তাঁদের নিয়মিত জাতীয় দলের পরিকল্পনায় রাখা, ফিটনেস ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
হামজা একটি দরজা খুলেছেন। শমিত সোম, ফাহমিদুল, জায়ান কিংবা কিউবার মতো খেলোয়াড়রা সেই দরজা দিয়ে আরও বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এখন দরকার বাংলাদেশের ফুটবলে সেই সম্ভাবনার যথাযথ ব্যাবহার নিশ্চিত করা।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬



