
ওসামা বিন লাদেন নেই, আয়মান আল-জাওয়াহিরিও নেই। কিন্তু আল-কায়েদা কি হারিয়ে গেছে? ২০০১ সালের সেই হামলার ২৫ বছর পর সংগঠনটির চেহারা বদলেছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দুর্বল হয়েছে, ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে, কিন্তু আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত এর সহযোগী গোষ্ঠীগুলো এখনো সক্রিয়।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালায় আল-কায়েদার ১৯ সদস্য। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ার ধ্বংস হয়, পেন্টাগনে আঘাত হানে একটি বিমান। চতুর্থ বিমানটি যাত্রীদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন।
সেদিনের পর বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করে। পরে ইরাকেও সামরিক অভিযান চালায়। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রে উঠে আসে। বিমানবন্দর নিরাপত্তা থেকে গোয়েন্দা তৎপরতা—সবকিছুতেই আসে বড় পরিবর্তন। কিন্তু ২৫ বছর পর প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে: আল-কায়েদা কোথায়? উত্তরটি সরল নয়।
বিন লাদেন নেই, সংগঠনটি আছে
১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে আল-কায়েদার উত্থান। আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় গড়ে ওঠা আরব যোদ্ধাদের নেটওয়ার্ক পরে একটি আন্তর্জাতিক জিহাদি সংগঠনে রূপ নেয়।
বিন লাদেনের লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই এবং তাঁর দৃষ্টিতে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা। ১৯৯০-এর দশকে আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এর চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর।
তারপরই শুরু হয় আল-কায়েদার বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযান। আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। আল-কায়েদার প্রশিক্ষণ শিবিরগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। সংগঠনের নেতারা ছড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন দেশে। কিন্তু সংগঠনটি টিকে যায়।
২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন অভিযানে বিন লাদেন নিহত হন। তাঁর উত্তরসূরি আয়মান আল-জাওয়াহিরিও ২০২২ সালে কাবুলে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন। বর্তমানে মিসরীয় জঙ্গি সেইফ আল-আদেলকে আল-কায়েদার কার্যত নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতেও তাঁকেই সংগঠনটির de facto leader হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিন লাদেনের সময়ের মতো আল-কায়েদার কোনো দৃশ্যমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কাঠামো এখন আর নেই। এটাই সংগঠনটির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।

এক সংগঠন থেকে বহু শাখা
৯/১১-এর পর আল-কায়েদার জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তবতা ছিল টিকে থাকা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটি আঞ্চলিক সহযোগী গোষ্ঠীর ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
ইরাক, সিরিয়া, উত্তর আফ্রিকা, আরব উপদ্বীপ, সোমালিয়া এবং সাহেল অঞ্চলে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সংগঠন গড়ে ওঠে। এই পরিবর্তনের ফলে আল-কায়েদা আগের তুলনায় কম কেন্দ্রীভূত হলেও বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সংঘাতের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার সুযোগ পায়।
রয়টার্সের ২৫তম বার্ষিকীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আফ্রিকায় আল-শাবাব ও জেএনআইএম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো এখনো সংগঠনটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইসলামিক স্টেট: পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর নতুন চ্যালেঞ্জ
আল-কায়েদার সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে ইসলামিক স্টেট। ইরাকে আল-কায়েদার শাখা থেকে আবু বকর আল-বাগদাদির নেতৃত্বে ইসলামিক স্টেটের উত্থান ঘটে। ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে তথাকথিত খেলাফত ঘোষণা করে সংগঠনটি।
এটি ছিল আল-কায়েদার জন্য বড় আঘাত। কারণ, ইসলামিক স্টেট একই জিহাদি পরিমণ্ডলের তরুণদের আকৃষ্ট করতে শুরু করে এবং আরও দ্রুত ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে।
দুই সংগঠনের মধ্যে মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও প্রকাশ্যে আসে। পরবর্তী সময়ে ইসলামিক স্টেট ইরাক ও সিরিয়ায় তাদের অধিকাংশ ভূখণ্ড হারায়। কিন্তু সংগঠনটির বিভিন্ন আঞ্চলিক শাখা এখনো সক্রিয়।
আল-কায়েদাও টিকে থাকে। অর্থাৎ ৯/১১-এর ২৫ বছর পর জিহাদি আন্দোলনের চিত্র একক কোনো সংগঠনকে কেন্দ্র করে নেই। বরং একাধিক সংগঠন, সহযোগী গোষ্ঠী ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের মধ্যে বিভক্ত।

আফ্রিকায় কেন আল-কায়েদার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে আল-কায়েদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোর একটি আফ্রিকা। সোমালিয়ায় আল-শাবাব এবং সাহেল অঞ্চলে জেএনআইএম নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছে। বিশেষ করে সাহেল অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, নিরাপত্তা সংকট এবং স্থানীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
এখানে আল-কায়েদার সহযোগী গোষ্ঠীগুলো শুধু হামলা চালানোর ওপর নির্ভর করে না। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির চেষ্টাও তাদের কার্যক্রমের অংশ। এ কারণে আল-কায়েদার বর্তমান শক্তি পরিমাপ করতে শুধু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
নুসরা ফ্রন্টের গল্পও আলাদা
সিরিয়ায় আল-কায়েদার সবচেয়ে পরিচিত শাখা ছিল নুসরা ফ্রন্ট। তবে এর নেতা আহমেদ আল-শারা পরে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি প্রথমে নুসরা ফ্রন্টকে পুনর্গঠন করেন, পরে সংগঠনটির নাম ও কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
২০২৪ সালের শেষ দিকে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর আল-শারা সিরিয়ার নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট হন। এই ঘটনাটি আল-কায়েদার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচ্ছেদও দেখায়।
একসময় আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত একজন কমান্ডার পরবর্তী সময়ে সেই আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্ক থেকে দূরত্ব তৈরি করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। এটি আল-কায়েদার বিকেন্দ্রীকরণের আরেকটি দিকও সামনে আনে: সংগঠনের সঙ্গে একসময় যুক্ত সব গোষ্ঠী বা নেতা একই রাজনৈতিক পথে এগোয়নি।
৯/১১-এর বিচার এখনো শেষ হয়নি
২৫ বছর পরও ৯/১১-এর আইনি অধ্যায় শেষ হয়নি। হামলার কথিত মূল পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহাম্মদ ২০০৩ সালে পাকিস্তানে আটক হন। পরে তাঁকে গুয়ানতানামো বে-তে নেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে বিচার বছরের পর বছর ধরে পিছিয়েছে।
২০২৬ সালের আগস্টে একজন মার্কিন সামরিক বিচারক অবশেষে ৫ জুন ২০২৮ থেকে খালিদ শেখ মোহাম্মদ ও আরও তিন আসামির বিচার শুরুর তারিখ নির্ধারণ করেন। তবে মামলাটি বহু বছর ধরে চলা প্রাক-বিচার আইনি জটিলতার কারণে আবারও বিলম্বিত হতে পারে।
মামলাটির একটি বড় সমস্যা হলো অভিযুক্তদের ওপর সিআইএ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং সেই সময়ে নেওয়া বক্তব্য আদালতে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। অর্থাৎ ৯/১১-এর ২৫ বছর পরও হামলার বিচারিক পরিণতি পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি।

১৯ হামলাকারী: চার বিমান, এক পরিকল্পনা
৯/১১ হামলায় অংশ নেওয়া ১৯ জনের মধ্যে ১৫ জন ছিলেন সৌদি আরবের নাগরিক। অন্যরা ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও লেবাননের নাগরিক। চারজন বিমান চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
মোহাম্মদ আত্তা ছিলেন প্রথম বিমানটির পাইলট। মারওয়ান আল-শেহহি দ্বিতীয় বিমানটি নিয়ন্ত্রণ করেন। হানি হানজুর তৃতীয় বিমান এবং জিয়াদ জাররাহ চতুর্থ বিমানটি নিয়ন্ত্রণ করেন। বাকি হামলাকারীদের দায়িত্ব ছিল বিমানগুলোর যাত্রী ও ক্রুদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।
তাঁদের জীবনের পেছনের গল্পও একরকম ছিল না। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিলেন, কেউ শিক্ষক ছিলেন, কেউ বিদেশে গিয়ে বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। কয়েকজন আগে আফগানিস্তান, বসনিয়া বা চেচনিয়ার সংঘাতে জড়িয়েছিলেন।
এই বৈচিত্র্যই দেখায়, আল-কায়েদা কীভাবে বিভিন্ন সামাজিক ও ভৌগোলিক পটভূমির মানুষকে একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছিল। ২৫ বছর পর আল-কায়েদা আসলে কোথায়? আল-কায়েদা ২০০১ সালের অবস্থানে নেই।
বিন লাদেন নেই। জাওয়াহিরি নেই। আফগানিস্তানে তাদের আগের ঘাঁটি নেই। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও আগের মতো দৃশ্যমান নয়। কিন্তু সংগঠনটি শেষ হয়ে যায়নি।
এর পরিবর্তে আল-কায়েদা অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভূত একটি নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। আফ্রিকা, সাহেল ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো স্থানীয় সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
এই পরিবর্তনটিই ৯/১১-এর ২৫ বছর পর আল-কায়েদাকে বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০০১ সালে আল-কায়েদা ছিল একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত আন্তর্জাতিক জিহাদি সংগঠন।
২০২৬ সালে সেটি অনেক বেশি ছড়িয়ে থাকা একটি নেটওয়ার্ক। তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘আল-কায়েদা কি বেঁচে আছে?’ নয়। প্রশ্ন হলো, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হারিয়েও কীভাবে একটি সংগঠনের মতাদর্শ, সহযোগী গোষ্ঠী ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক এত দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে? ৯/১১-এর ২৫ বছর পর আল-কায়েদার গল্প মূলত সেই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার গল্প।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬



