মুক্তবাক

নীরব আর্তনাদ : একজন স্বামী কখন কাঁদে?

কে.এ সুমন চৌধুরী: আমাদের সমাজে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ও তাঁদের অধিকার নিয়ে যথার্থভাবেই দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা, সচেতনতা ও আইনি সংস্কার হয়েছে। এটি অত্যন্ত জরুরি এবং ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। কিন্তু এই দৃশ্যমান বাস্তবতার আড়ালে আরও একটি রূঢ় ও অপ্রিয় সত্য ঢাকা পড়ে থাকে—তা হলো পুরুষের, বিশেষ করে একজন বিবাহিত পুরুষের নীরবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার গল্প।

‘পুরুষকে কাঁদতে নেই’ কিংবা ‘পুরুষ সবসময়ই শক্তিশালী’—সমাজের এই প্রচলিত ধারণার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একজন স্বামীর কান্না আমাদের সমাজ সহজে দেখতে পায় না। লজ্জা, সামাজিক সংকোচ এবং পুরুষত্বের কৃত্রিম সংজ্ঞার কারণে অনেকেই সেই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা প্রকাশ করতে পারেন না।

সম্মান ও মর্যাদা হারানোর সুতীব্র যন্ত্রণা
একজন স্বামী কখন কাঁদেন? তিনি তখনই কাঁদেন, যখন অনুভব করেন যে সংসারটিকে তিনি নিজের ভালোবাসা ও শ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে তাঁর ন্যূনতম আত্মসম্মান ও মর্যাদা ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।

দাম্পত্য জীবনে যখন প্রতিনিয়ত তাঁকে ঘরের চার দেওয়ালে অপমান করা হয়, কটু কথা বলা হয়, কিংবা শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়—তখন তাঁর সেই নীরব কান্না কোনো আইনি ফোরামে কিংবা সামাজিক আড্ডায় স্থান পায় না।

◉ মা-বাবা কেন আজ সন্তানের ‘বোঝা’

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি করা বেড়াজালে পুরুষ নিজেই এমন এক বন্দী, যেখানে নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললে উল্টো উপহাসের পাত্র হতে হয়। ফলে চোখের জল লুকিয়ে হাসিমুখে সমাজ ও সংসারের দায়িত্ব পালন করা ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় থাকে না।

অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও অবমূল্যায়নের নির্মম চিত্র
আমাদের সমাজে এখনো একজন পুরুষের সফলতার পরিমাপ করা হয় মূলত তাঁর আয়ের অঙ্ক দিয়ে। ধরা যাক একটি চেনা পরিস্থিতির কথা; কোনো স্বামী তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন, এমনকি ঘরের ও রান্নাবান্নার কাজেও স্ত্রীকে সমানভাবে সহযোগিতা করছেন। কিন্তু কোনো কারণে যদি তাঁর আয়ের পরিমাণ কমে যায়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি তীব্র অবমূল্যায়নের শিকার হন।

রান্নায় সামান্য কমবেশি হলে কিংবা প্রত্যাশা অনুযায়ী আর্থিক জোগান দিতে না পারলে তাঁকে প্রতিনিয়ত কটু কথা শুনতে হয়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে শারীরিকভাবেও আঘাত করা হয়। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

‘সংসার কোনো বাণিজ্যিক লেনদেনের জায়গা নয়, এটি একটি মানসিক ও সামাজিক অংশীদারিত্ব। আয়ের গ্রাফ নিচে নেমে গেলে একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় মানসিক সহযোগিতা, উৎসাহ ও সহমর্মিতা—উপহাস বা শারীরিক নির্যাতন নয়।’

দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি
একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন কোনো একক আধিপত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। একটি সুন্দর সংসারের জন্য প্রয়োজন কিছু মৌলিক উপাদান:

পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য ও সহনশীলতা: অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, একে অপরের প্রতি মানুষের মতো সম্মান থাকা বাধ্যতামূলক। সংকটের সময়ে একে অপরের ত্রুটিগুলোকে বড় না করে পাশে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা।

◉ ১২ বছরে ৩,৮৬০ প্রাণহানি, বাঁচতে চাইছি শুধু স্লোগানে!

নিঃশর্ত দায়িত্ববোধ: কেবল নিজের অধিকার আদায়ের লড়াই নয়, বরং পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা। পারিবারিক সহিংসতা নারী বা পুরুষ—কারও প্রতিই সমর্থনযোগ্য নয়। নির্যাতন কখনো লিঙ্গভিত্তিক হতে পারে না; নির্যাতন সব রূপেই অন্যায় এবং অপরাধ।

ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ও সমানুভূতির আহ্বান
আমাদের সমাজে যেমন নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও নাগরিক হিসেবে আমাদের পরম কর্তব্য, ঠিক তেমনি কোনো পুরুষ যদি নির্যাতনের শিকার হন, তাঁর প্রতিও সমান সহানুভূতি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যায়ের কোনো জেন্ডার বা লিঙ্গ হয় না। পুরুষ নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে আড়ালে রেখে আমরা কখনোই একটি সুস্থ ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ করতে পারব না।

একটি সুন্দর ও ভালোবাসাময় পরিবার গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান, গভীর বোঝাপড়া ও নিঃস্বার্থ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে। অর্থনৈতিক উত্থান-পতন জীবনেরই অংশ, কিন্তু তা যেন কোনো মানুষের আত্মসম্মান কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার না হয়।

তাই আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ ও পারিবারিক সংস্কৃতি গড়ে তুলি, যেখানে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পরম সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন। যেখানে পুরুষের কান্নাকে ‘দুর্বলতা’ হিসেবে উপহাস না করে, একজন মানুষের হৃদয়ের হাহাকার হিসেবে অনুধাবন করা যায়।

নিউজ নাউ বাংলা/এফওয়াই/ জেডআরসি/ ‌৩০ জুন ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button