
দেশে একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। একদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় এক হাজারের ঘরে পৌঁছেছে, অন্যদিকে ডেঙ্গুতেও মৃতের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে গেছে। দুই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর ঢল নামায় চরম সংকটে পড়েছে চিকিৎসা ব্যবস্থা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে দুজন এবং খুলনায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত কেবল হামের উপসর্গ নিয়েই সারাদেশে ৮৯৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর বাইরে ল্যাব পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছেন আরও ১০০ জন।
হামের প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে ঢাকা বিভাগে। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উপসর্গ নিয়ে ঢাকায় সর্বোচ্চ ৪০৩ জন, সিলেটে ১৫৫, রাজশাহীতে ৯২, ময়মনসিংহে ৭৫, চট্টগ্রামে ৬৫, বরিশালে ৫৬, খুলনায় ৩৭ এবং রংপুরে ১৪ জন মারা গেছেন। মৃত্যুর পাশাপাশি হাসপাতালে রোগীর চাপও উদ্বেগজনক।
সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ১৫৬ জন উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এলে ১ হাজার ১০২ জনকে ভর্তি করা হয়। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত হাম নিয়ে হাসপাতালে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৭০ জনে।

হামের এই ভীতির মধ্যেই ডেঙ্গু পরিস্থিতিও ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ জনে, যার মধ্যে কেবল চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম কয়েক দিনেই মারা গেছেন ২৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৩১৪ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০৭ জন ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে।
তবে ঢাকার বাইরে খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও ময়মনসিংহেও সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। চলতি বছরের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৪৩ হাজার ৯০৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪০ হাজার ৭০৯ জন।
গত বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চলতি বছরের বাকি সময়টিতে যদি সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকে, তবে বিগত বছরের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম ও ডেঙ্গু সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের দুটি রোগ হলেও একই সময়ে দুটির প্রাদুর্ভাব স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অভূতপূর্ব দ্বৈত চাপ সৃষ্টি করেছে। এ সংকট মোকাবিলায় জরুরিভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে টিকাদান (ভিওপিভি/এমআর) কার্যক্রম আরও জোরদার করা এবং আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে ডেঙ্গু দমনে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, নিয়মিত লার্ভিসাইডিং, এলাকাভিত্তিক সঠিক নজরদারি এবং রোগীদের দ্রুত তরল ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত করতে হবে। তারা বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেছেন, কেবল রাজধানী নয়—বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও শয্যাসংখ্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সক্ষমতা অবিলম্বে না বাড়ালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬



