
সরকারের নীতিনির্ধারণী কেন্দ্র সচিবালয়ে কাজের গতিতে মারাত্মক মন্থরতা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও ফাইল প্রস্তুত থাকার পরও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বারংবার তাগাদা ও নির্দেশ উপেক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নথি দিনের পর দিন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের টেবিলে আটকে থাকছে। ফলে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে মারাত্মক দীর্ঘসূত্রতা।
সচিবালয়ের একাধিক মন্ত্রণালয় সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে, কর্মকর্তাদের একাংশের নীরব অসহযোগিতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা এবং ফাইল আটকে রাখার মানসিকতার কারণে সরকারের কর্মপরিকল্পনায় কচ্ছপগতি তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি এক প্রতিমন্ত্রী তাঁর দপ্তরের ফাইল আটকে থাকা দেখে সংশ্লিষ্ট সচিবকে ফোন করে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত কাজ নিষ্পত্তির হুঁশিয়ারি দেন। অন্যদিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে এক কর্মকর্তার পদায়ন ক্লিয়ারেন্স মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবের টেবিলে মাসের পর মাস আটকে থাকার পর অবশেষে মন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে তা সমাধান হয়।
জনপ্রতিনিধিদের ক্ষোভ ও উন্নয়ন প্রকল্প স্থবির: সচিবালয়ে আসা একাধিক সংসদ সদস্য তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। খুলনার একটি আসনের সংসদ সদস্য জানান, নিজ এলাকার একটি জরুরি উন্নয়ন কাজের জন্য তিনি টানা ছয় মাস ধরে সচিবালয়ে ধরণা দিচ্ছেন, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক টালবাহানায় কাজ শেষ হয়নি। জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ—শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশ দেওয়া হলেও নিচের স্তরে গিয়ে ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে থাকে, যা তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় জবাবদিহির মুখে ফেলছে।
প্রশিক্ষণ ও মানসিকতার ঘাটতি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মুসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমলাদের মানসিকতা বদলাতে প্রশিক্ষণ মডিউলে পরিবর্তন আনা জরুরি। বিপিএটিসি ও বিসিএস প্রশাসন একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানে পেশাদারিত্বের আদর্শ যুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া সংসদকে শক্তিশালী করে জবাবদিহি ও শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে প্রশাসনের কাজের গতি ফেরানো সম্ভব।
রাজনৈতিক পদায়ন ও অদক্ষতা: জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়ার মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় শীর্ষ পদে পদায়নের কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। যোগ্য, দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের কাজ করতে না দিয়ে পছন্দের অদক্ষদের বসানোর ফলে সিদ্ধান্তহীনতা বাড়ছে। আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক আনুকূল্যের ঊর্ধ্বে না তুললে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সার্বিক বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী স্বীকার করেন যে, ফাইল আটকে থাকার অভিযোগ অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও বাস্তব। তিনি জানান, ‘রুলস অব বিজনেস’ এবং সচিবালয় নির্দেশিকা অনুযায়ী ফাইল আটকে রাখা সরকারি আদেশ অমান্যের শামিল। প্রশাসনের সার্বিক গতি ফেরাতে এবং নিয়মকানুন কঠোরভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনে সচিবদের নিয়ে বৈঠকে বসে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬



