
ফুটবলের সবচেয়ে রোমান্টিক, একইসঙ্গে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক উপাখ্যানের নাম সম্ভবত লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনা। সোমবার (৩১ আগস্ট) এক খোলা চিঠিতে সেই ২১ বছরের মহাযাত্রার সমাপ্তি টানলেন ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তি।
অবসরের ঘোষণা দেওয়ার ২৩ মিনিট পর নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দুই মিনিটের একটি ভিডিও পোস্ট করেন তিনি। ক্যাপশনে শুধু লেখা ‘এআর’ (AR) এবং একটি লাল হৃদয়ের ইমোজি। কিন্তু ওই দুই মিনিটেই যেন পুরো ফুটবল বিশ্বের হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
সোলেদাদ পাস্তোরুত্তির বিখ্যাত স্প্যানিশ গান ‘ব্রিন্দিস’-এর সুর দিয়ে শুরু হওয়া ভিডিওটিতে প্রথমে দেখা যায় পাড়ার ক্লাবের জার্সি পরা সেই ছোট্ট মেসিকে। এক সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘তোমার স্বপ্ন কী?’ ঠিক ম্যারাডোনার স্টাইলে লাজুক হাসিতে মেসি বলেন, ‘আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা।’
পরের দৃশ্যেই আকাশী-সাদা জার্সিতে সেই স্বপ্ন পূরণের চিত্র। এরপর আসে জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির একের পর এক মুহূর্তের ছবি। গভীর মনোযোগ, গোল উদযাপন, প্রতিপক্ষকে ড্রিবল করে বোকা বানানো, মাথা নিচু করে থাকা, চোখে জল, কিংবা ম্যারাডোনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা— ১০ নম্বর জার্সির প্রতিটি অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।

তবে এই বিদায় কেবল একটি ফেসবুক পোস্ট বা ভিডিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনের গল্পটা আরও মর্মান্তিক। গত মাসে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হৃদয়বিদারক হারের মাত্র দুই দিন পর, ২১ জুলাই এই বিদায়ী বার্তাটি লিখে রেখেছিলেন মেসি। কিন্তু সেটি প্রকাশ করতে দেরি হয়। কারণ, গত ৮ আগস্ট ৬৮ বছর বয়সে মারা যান তার বাবা হোর্হে মেসি।
শোকে স্তব্ধ মেসি নিজের বার্তায় জানিয়েছেন, “আজ আমার বাবার ঘটনার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।” ভিডিওটির শেষ ভাগে দেখা যায় আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির জেতা সব ট্রফি উদযাপনের মুহূর্তগুলো।
২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে লাল কার্ড দিয়ে যে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল, তা আজ শেষ হলো রূপকথার চেয়েও বিশাল এক অর্জনের ডালি সাজিয়ে। ২০০৮ সালে অলিম্পিক সোনা জয় দিয়ে শুরু। এরপর দীর্ঘ আক্ষেপ আর যন্ত্রণার প্রহর শেষে আসে সেই সোনালী যুগ।
২০২১ সালে ব্রাজিলকে তাদের মাটিতে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়, এরপর ২০২২ সালে ফিনালিসিমা এবং কাতারে সেই আরাধ্য বিশ্বকাপ জয়। সবশেষ ২০২৪ সালেও কোপা আমেরিকার শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিলেন তিনি। স্পেনের বিপক্ষে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালই হয়ে রইল তার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল নিয়ে তিনি বিদায় নিচ্ছেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে।

সোলেদাদ পাস্তোরুত্তির ‘ব্রিন্দিস’ গানটি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বার্তা প্রকাশের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের ঠিক এক মাস পর মেসি ব্যাকগ্রাউন্ডে এই গানটি রেখেই একটি ভিডিও শেয়ার করেছিলেন। ২০০৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার জন্যও এই গানটিই গেয়েছিলেন সোলেদাদ।
ভিডিওর শেষ অংশে সোলেদাদের জোরালো কণ্ঠ থামিয়ে শোনা যায় মেসির নিজের কথা, ‘আমি আমার ফুটবল ক্যারিয়ার এমনভাবে শেষ করতে চাই যেন জাতীয় দলের হয়ে অন্তত কিছু জিততে পেরেছি। বারবার হোঁচট খাওয়া, আবার উঠে দাঁড়ানো এবং স্বপ্নের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া—কারণ এটাই জীবন।’
ভিডিওটি শেষ হয় ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাজপথে নেমে আসা লাখো মানুষের দৃশ্যের সঙ্গে, যারা একসুরে চিৎকার করে গাইছিলেন ‘মেসি, মেসি, মেসি’। আজ সেই স্লোগান হয়তো আরও জোরালো হবে, কিন্তু আকাশী-সাদা জার্সিতে জাদুকরকে আর মাঠে দেখা যাবে না।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬



