
জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আহরণে ধীরগতির কারণে বেসরকারি খাত যখন চরম চাপের মুখে, ঠিক তখনই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়িয়ে ‘নবম জাতীয় বেতন কাঠামো (পে স্কেল)’ অনুমোদন করেছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকর হবে। ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে সব ভাতা কার্যকর হবে।
বেতন ও ভাতার বিস্তারিত চিত্র
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-২০ ভুক্ত (অষ্টম শ্রেণি পাস) কর্মচারীদের মূল বেতন ১৪২% বেড়েছে। মূল বেতনের সঙ্গে ৫০-৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও মোবাইল ভাতা যুক্ত হলে তাঁদের মোট মাসিক বেতন দাঁড়াবে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের (সচিব) গ্রেড-১ কর্মকর্তাদের মূল বেতন শতভাগ বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১৫ বছরে সচিবদের বেতন বাড়ল প্রায় ২৯০ শতাংশ।
‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ ও নতুন সুবিধা
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী নতুন পে স্কেলে সামরিক ও অসামরিক সব ক্ষেত্রে ‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ প্রথা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে একই পদে থেকে অবসরে যাওয়া পুরনো ও নতুন চাকরিজীবীদের পেনশনের বৈষম্য দূর হবে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে।
এছাড়া, পুরনো পেনশনভোগীদের জন্য মাসিক নিট পেনশনের পরিমাণ ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান থাকা কর্মচারীরা প্রতি সন্তানের জন্য মাসিক ৩,০০০ টাকা ভাতা পাবেন। আগে কেবল ৫ম গ্রেড পর্যন্ত মোবাইল ফোন ভাতা পেলেও, এখন সব কর্মচারী এই ভাতা পাবেন।
অর্থনীতির ওপর চাপ ও মন্ত্রিসভার আপত্তি
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সরকারের বর্তমান আর্থিক সংকট ও জ্বালানি আমদানির চাপের কথা বিবেচনা করে মন্ত্রিসভার কয়েকজন মন্ত্রী এই মুহূর্তে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তবে সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এটি অনুমোদন দেন।
জানা গেছে, ২০২৮ সালে সব ভাতা কার্যকর হলে বেতন-ভাতায় সরকারের বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরে আদায় হওয়া মোট রাজস্বের প্রায় অর্ধেক।
বেসরকারি খাতে প্রভাব ও বৈষম্যের শঙ্কা
সরকারি চাকরিজীবীদের এই বিপুল পরিমাণ বেতন বৃদ্ধির কারণে বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও বৈষম্য বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সরকার নিযুক্ত এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুর রহমান মনে করেন, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে বেসরকারি খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তিনি বলেন, “নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হওয়ায় মূল্যস্ফীতি খুব একটা বাড়বে না। ফলে বেসরকারি খাতও তাৎক্ষণিক কোনো চাপে পড়বে না।”
অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, রাজস্ব না বাড়িয়ে ব্যাংক ঋণ বা টাকা ছাপিয়ে এই ব্যয় মেটানো হলে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
পটভূমি ও অতীত অভিজ্ঞতা
হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চাকরিজীবীদের দাবির মুখে একটি পে-কমিশন গঠন করেছিল। নির্বাচনের ঠিক আগে ওই কমিশন সর্বনিম্ন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাস্তবায়ন না করে নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেয়।
এর আগে ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেলে শতভাগ বেতন বাড়ানোর সময় তৎকালীন সরকার দাবি করেছিল, এতে দুর্নীতি কমবে। তবে ওই সময়কার অর্থসচিব ড. মাহবুব আহমেদ জানান ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, “শতভাগ বেতন বৃদ্ধির পরও প্রশাসনে দুর্নীতি কমেনি, বরং বেড়েছে। তবে সৎ কর্মকর্তাদের কথা বিবেচনা করে দীর্ঘ ১১ বছর পর বেতন কাঠামো পরিবর্তনের যৌক্তিকতা রয়েছে।”
এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও সাংবাদিকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬



