Leadএনএনবি বিশেষবাংলাদেশ

দপ্তর এক, ভাষ্য আরেক: মন্ত্রীদের অতিকথনে বিব্রত সরকার!

মন্ত্রীদের দায়িত্বসীমা ও জবাবদিহি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অনেকে নিজের এখতিয়ারের বাইরে ক্ষমতা দেখাতে ভালোবাসেন। তাদের কাছে রাজনীতি মানেই ক্ষমতার চর্চা, সেটি ক্ষমতার অপব্যবহার হলেও কোনো অনুশোচনা করতে দেখা যায় না প্রায়ই।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পরও তাদের কাজের সীমানা কাগজে যতটা স্পষ্ট, বক্তব্যে ততটাই ঝাপসা। নিজের দপ্তরের বাইরে অন্য মন্ত্রণালয়ের নীতি, সিদ্ধান্ত কিংবা সংকট নিয়েও তাদের মন্তব্য করতে দেখা যায়।

শুধু অন্য মন্ত্রণালয় নয়, কখনো কখনা নিজ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে বসেন। এতে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নিয়ে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। সরকার ও মুখ বদলালেও এই ‘সবজান্তা’ প্রবণতা কেন টিকে থাকে—প্রশ্নটি তাই ব্যক্তির নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জবাবদিহির।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার দুদিনের মাথায় মন্ত্রীর কথাই সরকারের জন্য প্রথম অস্বস্তির একটি উৎস হয়ে ওঠে। ১৯ ফেব্রুয়ারি সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, মালিক-শ্রমিকের “সমঝোতায়” তোলা টাকা চাঁদা নয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ একে অনৈতিক, যোগসাজশমূলক দুর্নীতি বৈধ করার চেষ্টা বলে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চায়। বিষয়টি তার দপ্তরেরই; কিন্তু মন্তব্যের মধ্যে নিজের এখতিয়ারের অনিয়মকে স্বাভাবিক করে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করে।

পরদিন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন কচুয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের সামনে বলেন, রাতে কিশোরেরা ঘুরলে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে; এতে সংবিধান লঙ্ঘন হলে “পরে দেখা যাবে”। পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন, শিক্ষামন্ত্রী কি পুলিশকে এমন নির্দেশ দিতে পারেন? শুধু তাই নয়, সংবিধান লঙ্ঘন হলে “পরে দেখা যাবে” বলা ক্ষমতার অপব্যবহার নয় কি?

সমালোচনার পর তিনি ব্যাখ্যা দেন, এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় ঘোষণা নয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে তার নির্বাচনি অঙ্গীকার। একানে একটি বড় বিষয় হলো, একই ব্যক্তি কখন এমপি, কখন দলীয় নেতা, কখন রাষ্ট্রের মন্ত্রী—শ্রোতার পক্ষে সেই টুপি আলাদা করা প্রায় অসম্ভব।

২১ ফেব্রুয়ারি কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ কুমিল্লাকে বিভাগ করার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন। যদিও প্রশাসনিক বিভাগ গঠন তার বরাদ্দকৃত তিন দপ্তরের কোনোটির কাজ নয়।

পরে ধারাটি বদলায়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে “কোচিং সেন্টার”-সদৃশ বলেন। এরপর তিনি ব্যাখ্যা দেন, সেটি ছিল অনানুষ্ঠানিক আলাপে তার ব্যক্তিগত মত, সরকারি নীতি নয়।

এদিকে এপ্রিলের জলাবদ্ধতায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, চট্টগ্রাম পানির ওপর ভাসছে না, পানি চট্টগ্রামের ওপর ভাসছে।’ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও খবরে দেখা গেছে, অন্তত ২০টি এলাকা প্লাবিত, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত এবং কোথাও ছয় থেকে আট ঘণ্টা পানি ছিল।

তাই বিষয়টি নিয়ে ভাষাগত শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা নিয়ে কথা বলার কোনো সুযোগ নয়। আসল কথা হলো মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হলো কি না। এধরনের বক্তব্য সমস্যার গভীরতা হালকা করার প্রয়াসমাত্র।

জুলাইয়ে বন্যার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের “ফার্মের মুরগি” বলায় শিক্ষামন্ত্রীকে সংসদে দুঃখ প্রকাশও করতে হয়। আগস্টে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এমপিদের পাঁচ লাখ ও মন্ত্রীদের ১০ লাখ টাকা বেতন দেওয়ার প্রস্তাব করেন। জনপ্রতিনিধিদের বেতন ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রশ্নটিও তার দপ্তরের নীতি নয়।

সব ঘটনা একই রকম অপরাধ নয়। কোথাও সীমালঙ্ঘন, কোথাও তথ্যের বদলে ব্যক্তিগত রায়, কোথাও অসংবেদনশীল ভাষা বা বাস্তবতা অস্বীকার। অভিন্ন সূত্র হলো—মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কথা রাষ্ট্রীয় সংকেত হয়ে যায়।

আইনি-প্রশাসনিক সীমাটি সূক্ষ্ম। সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদে মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়ী। ফলে একজন মন্ত্রী সরকারের সামগ্রিক, অনুমোদিত নীতি ব্যাখ্যা করতেই পারেন। কিন্তু যৌথ দায় মানে যৌথভাবে অনুমোদিত অবস্থান—অন্য মন্ত্রণালয়ের নীতি তাৎক্ষণিকভাবে বানিয়ে দেওয়া কোনো ঘোষণা দেওয়া নয়।

রুলস অব বিজনেসে বিষয়ভিত্তিক মন্ত্রণালয় বণ্টন, আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের কাঠামো রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মন্ত্রী ব্যক্তিগত মতকে সরকারি সিদ্ধান্তের পোশাক পরালেন কি না, কিংবা নিজের কথায় অন্য কোনো সংস্থার ওপর কার্যত নির্দেশের চাপ তৈরি করলেন কি না?

কেন বারবার ঘটে
বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে মন্ত্রীকে জাতীয় নীতিনির্ধারকের চেয়ে এলাকার সর্বময় সমস্যা-সমাধানকারী হিসেবে মনে করা হয়। কুমিল্লা বিভাগ বা কচুয়ার পুলিশি নির্দেশ সেই স্থানীয় চাপের ছাপ।

দলে আনুগত্য ও জনসভায় তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তাও এর একটি বড় কারণ হতে পারে বলে মনে করেন কেউ কেউ। জনপ্রিয় কথা বললে মিডিয়া কভারেজও পাওয়া যায়; আবার জনগণও বাহবা দেয়। কিন্তু সেই তুলনায় নীরব প্রস্তুতির রাজনৈতিক বাজারমূল্য কম। কিন্তু নির্ভুল নীতিকথার প্রচার কম।

এরকম কয়েকটি ঘটনার পর ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের নিজ দপ্তরের বাইরে মন্তব্য না করতে এবং যাচাই করা নীতিভিত্তিক তথ্য দিতে নির্দেশ দেন। এছাড়া মার্চে ১৮০ দিনের কর্মমূল্যায়নের প্রতিবেদনে দপ্তরের বাইরে বিতর্কিত বক্তব্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষের কথাও বলা হয়।

কিন্তু কোন মন্তব্যে কার কী আনুষ্ঠানিক জবাবদিহি হয়েছে, তা প্রকাশ্যে জানা যায়নি। সতর্কবার্তা সংস্কৃতি বদলায় না, যদি ভুল স্বীকার, দ্রুত সংশোধন ও দৃশ্যমান পরিণতি প্রাতিষ্ঠানিক না হয়।

এমন বেফাঁস মন্তব্য শুধু বর্তমান সরকারের আমলেই নয, এর আগেও এধরনের মন্তব্য ও অন্য মন্ত্রণালয় নিয়ে অনধিকার চর্চা হয়েছে একাধিকবার। তাই রাষ্ট্রীয় ভাষ্যের নীতি নির্ধারণ জরুরি।

লিখিত মন্ত্রী-আচরণবিধি, অন্য দপ্তরের বিষয়ে বাধ্যতামূলক সমন্বয়, ভুল বক্তব্যের প্রকাশ্য সংশোধন-নথি, সংসদীয় কমিটিতে জবাব এবং নিয়মিত গণমাধ্যম ও সাংবিধানিক প্রশিক্ষণ চালু হলে এসব কমতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশে মন্ত্রীরা বদলাবেন; বেফাঁস কথার সংস্কৃতি বদলাবে না।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button