
কাইয়ুম আহমেদ, ঢাকা : দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে বেলুচিস্তান এখন আর কেবল পাকিস্তানের একটি প্রদেশ নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটি নিয়ে চীন, ভারত, পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।
চীনের সিপিইসি ও কৌশলগত আকাঙ্ক্ষা
বেলুচিস্তানের গোয়াদর বন্দর চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর মুকুটে উজ্জ্বল পালক। বেইজিংয়ের জন্য এই বন্দর কেবল একটি বাণিজ্যিক রুট নয়, এটি মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরাসরি আরব সাগরে পৌঁছানোর একটি লাইফলাইন। তবে সিপিইসি প্রকল্প নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ চীনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার হুমকি তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট ও স্বাধীনতার দাবি
বেলুচিস্তানের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশে অবস্থানরত বেলুচ জাতীয়তাবাদী নেতাদের ‘স্বাধীন বেলুচিস্তান’-এর দাবিতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগ বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য এক কঠিন সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের উদ্বেগ ও কৌশলগত অবস্থান
নয়াদিল্লি বেলুচিস্তানের ঘটনাবলিকে সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। কাশ্মির ইস্যুসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও ভারতের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার প্রেক্ষিতে, বেলুচিস্তানের অস্থিরতা ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ফ্যাক্টর। বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান অক্ষের প্রভাব মোকাবিলায় ভারত এই অঞ্চলকে তার বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সম্পৃক্ততা ও প্রভাব
বেলুচিস্তানের অস্থিতিশীলতায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভূমিকাও উপেক্ষা করার মতো নয়। ইরান-পাকিস্তান সীমান্তের অস্থিরতা এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর সিপিইসি প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের ছায়া বেলুচিস্তানের ওপর পড়ছে। এটি অঞ্চলটিকে বহুপক্ষীয় প্রভাব বলয়ের একটি জটিল প্রক্সি জোনে পরিণত করেছে।
প্রাকৃতিক সম্পদ: ক্ষমতার নতুন চাবিকাঠি
সোনা, তামা, তেল এবং গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডার বেলুচিস্তানকে বৈশ্বিক নজরদারির কেন্দ্রে এনেছে। রিকো ডিক (Reko Diq)-এর মতো বিশাল খনিজ প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আগামী দিনে বিশ্বশক্তির লড়াই আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্পদ আহরণ এবং নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।
বেলুচিস্তান ইস্যু এখন আর কেবল পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। চীন ও ভারতের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পাকিস্তানের টিকে থাকার লড়াই এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব—সব মিলিয়ে এটি একটি আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। অঞ্চলটি উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের রণক্ষেত্র হবে, তা নির্ভর করবে এই চার শক্তি নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ কতটা পরিপক্কতার সাথে সমন্বয় করতে পারে তার ওপর।
এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বেলুচিস্তানের সমস্যা এখন আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। একদিকে চীনের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে পাকিস্তানের টিকে থাকার লড়াই, এবং এর সঙ্গে ভারতের কৌশলগত লক্ষ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের স্বার্থ—সব মিলিয়ে বেলুচিস্তান এখন এক ভয়াবহ গোলকধাঁধায়।
যদি সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলো তাদের নিজস্ব স্বার্থকে ঊর্ধ্বে রেখে স্থানীয় জনগণের অধিকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য না দেয়, তবে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে কেবল উন্নয়নের করিডোর নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও ছায়াযুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত হবে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থায়িত্ব এখন অনেকটাই নির্ভর করছে বেলুচিস্তানের এই জটিল সমীকরণ কীভাবে সমাধান করা হয়, তার ওপর।
এই সংঘাত নিরসনে কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক সমাধান যথেষ্ট নয়; এখানে প্রয়োজন স্থানীয় অংশীদারিত্ব এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ। অন্যথায়, বড় শক্তির লড়াইয়ে কেবল বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির শিকার হতে থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
নিউজ নাউ বাংলা/ কেএ/ জেডআরসি/ ১৮ জুলাই ২০২৬



