বাংলাদেশ

‘অজ্ঞাতনামা’ আসামির ফাঁদে মামলা-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগ

রূপগঞ্জে হত্যাচেষ্টা মামলা ঘিরে ভিলেজ পলিটিক্স

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সহকর্মীর হাতে মিজানুর রহমান নামের এক যুবক গলা কেটে হত্যাচেষ্টার শিকার হওয়ার ঘটনাটি মোড় নিয়েছে ভিন্ন খাতে। মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসার ব্যয়ভারের অজুহাত এবং এজাহারে কৌশলে যুক্ত করা ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’র ফাঁদ পেতে রমরমা ‘মামলা বাণিজ্য’ ও চাঁদাবাজিতে মেতে উঠার অভিযোগ উঠেছে মামলার বাদী আতিবুর রহমানের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে গ্রামে নিজের প্রতিপক্ষ, অসহায় আত্মীয়স্বজন এবং বৃদ্ধ চাচাকে চরম হয়রানি ও ভিটেমাটি ছাড়া করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

‘অজ্ঞাতনামা’ আসামির আড়ালে ব্ল্যাকমেইলিং
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৩ আগস্ট রূপগঞ্জের তারাব এলাকায় ‘সোনালী পেপার মিলস’-এ ঘুমন্ত মিজানুর রহমানকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালান তার আপন ফুফাতো ভাই এমদাদুর রহমান। ঘটনার পর মিজানের ছোট ভাই আতিবুর রহমান বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় ৩০৭ ধারায় একটি মামলা (মামলা নং- ৮) দায়ের করেন। এজাহারে মূল অভিযুক্ত এমদাদের পাশাপাশি কৌশলে ১০-১২ জন ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, এই অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকাকে হাতিয়ার বানিয়ে গ্রামে অভিনব চাঁদাবাজি ও সামাজিক ব্ল্যাকমেইলিং শুরু করেছেন বাদী আতিবুর। তদন্তকারী সংস্থাকে প্রভাবিত করে চার্জশিটে গ্রামের নিরীহ মানুষ ও পারিবারিক শত্রুদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ইতোমধ্যেই আতিবুর প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

চিকিৎসার খরচের নামে জিম্মি ও বিভ্রান্তি
এলাকাবাসী ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মিজানের পেছনে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে এলাকায় প্রচার করছেন আতিবুর। অথচ সরকারি এই হাসপাতালে চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার ও পরিচর্যা নিখরচায় হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের জন্য আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে থাকতে পারে।

বরং উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই মিজানকে তড়িঘড়ি গ্রামে নিয়ে আসা হয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশের ধারণা, রোগীকে সঠিক চিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে প্রতিপক্ষকে পূর্ণাঙ্গ ‘হত্যা মামলা’য় ফাঁসানোর এক দূরভিসন্ধি চালাচ্ছেন আতিবুর।

জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও আসামির মানসিক স্বাস্থ্য
ঘটনার নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, মূল অভিযুক্ত এমদাদুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এবং ২০০৫ সালে বিষপানসহ একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত এমদাদ জানান, তার একমাত্র সম্বল নানার দেওয়া দুই কানি জমি সুকৌশলে সাদা কাগজে স্বাক্ষর ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে নিজের নামে লিখে নেন মিজান। এই ঘটনার জের এবং জমি হারানোর ক্ষোভ থেকেই তিনি এমন চরম পদক্ষেপ নেন।

বৃদ্ধ চাচা ও অসহায় পরিবারের ওপর নিপীড়ন
আতিবুরের এই মামলা বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন তার ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ বড় চাচা, দেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইমাম উদ্দিন। শিশুকাল থেকে এমদাদ এই বড় মামার ঘরে লালিত-পালিত হওয়ায় বৃদ্ধ চাচা ও তার পরিবারকে মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অথচ মিজানকে নিজের ভাতিজা বিবেচনা করে বৃদ্ধ চাচা ৮০ হাজার টাকা এবং ছোট চাচার পরিবার ৫০ হাজার টাকাসহ স্বজনরা মানবিক কারণে চিকিৎসার অর্থ জুগিয়েছিলেন।

বর্তমানে একা থাকা এই বৃদ্ধের বাড়িতে চড়াও হয়ে তাণ্ডব চালানো ও মোটা অঙ্কের অর্থের জন্য ক্রমাগত হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, মূল অভিযুক্ত এমদাদ কারাগারে থাকায় তার তিন নাবালক সন্তানকে নিয়ে অসুস্থ স্ত্রী চরম অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন; আতিবুরের ভয়ে তাদের সাহায্য করতেও সাহস পাচ্ছেন না প্রতিবেশীরা।

বাদীর বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি
স্বজনদের জিম্মি করা ও টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বাদী আতিবুর রহমান ক্ষোভের সাথে জানান, প্রতিপক্ষকে চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্যই মামলায় সবার নামযুক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন তিনি।

এদিকে চিকিৎসার নামে স্বজনদের জিম্মি করে অর্থ আত্মসাৎ, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো এবং প্রাণনাশের হুমকির প্রতিবাদে আতিবুরের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে লিখিত অভিযোগসহ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button