
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: রঙ-তুলিতে মুক্ত স্বদেশ’ শীর্ষক চিত্রপ্রদর্শনীতে একটি শিল্পকর্মকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা একটি চিত্রকর্মের নান্দনিক মূল্যায়ন বা মতপার্থক্যের বিষয় নয়; এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাস, মহান মুক্তিযুদ্ধের সুমহান অর্জন এবং কাঠামোগত দায়িত্ববোধের এক গভীর সংকটকে উসকে দিয়েছে।
৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একটি দাঁড়িপাল্লার দুই প্রান্তে মুখোমুখি দাঁড় করানোর এই অপপ্রয়াস সমাজে ও রাষ্ট্রে এক বিপজ্জনক ঐতিহাসিক বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে।
বিতর্কিত চিত্রকর্ম ও এর বিষয়বস্তু
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া একটি শিল্পকর্মে দেখা যায়, একটি মুষ্টিবদ্ধ হাত একটি দাঁড়িপাল্লা ধরে আছে। পাল্লার একপাশে লাল রঙে ‘৭১’ এবং অপরপাশে কালচে রঙে ‘২৪’ লেখা রয়েছে, যেখানে ‘২৪’-এর দিককার পাল্লাটি খানিকটা নিচের দিকে ঝুঁকে ভারী দেখানো হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকে ওজনে বা গুরুত্বে বেশি ভারী বা ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বক্তাদের বক্তব্য ও অবস্থান
শিল্পীর বক্তব্য: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চিত্রকর্মটির শিল্পী ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করেন, জুলাই অভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের বিপরীতে দাঁড় করানোর কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। জুলাইয়ের পর থেকেই একটি বিশেষ গোষ্ঠী চব্বিশকে একাত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে আসছে—তাঁর কাজটি মূলত প্রতীকী অর্থে সেই ‘অসম তুলনা’ ফুটিয়ে তোলার এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রচারণার কাউন্টার দেওয়ার একটি অলংকারিক উপস্থাপন ছিল।
চারুকলা অনুষদের ডিন মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, উদ্বোধনী দিনে তিনি ক্যাম্পাসে ছিলেন না এবং ছবিটি দেখার সুযোগও তাঁর হয়নি। তিনি জানান, নিবন্ধনের মাধ্যমে ছবিগুলো নির্বাচিত হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্বে ছিলেন সিরামিকস অ্যান্ড স্কাল্পচার বিভাগের অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম।
অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডিনের অনুপস্থিতিতে তিনি শুধু একটি চিঠিতে সই করেছিলেন এবং ছবিগুলো বিস্তারিত যাচাই না করেই জমা নেওয়া হয়েছিল।
জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রদর্শনীটি চারুকলা অনুষদের তত্ত্বাবধানে হয়েছে এবং জনসংযোগ দপ্তরের কাজ ছিল কেবল সিনেট ভবনের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া। ছবিগুলোর গভীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাদের আগে থেকে কিছু জানা ছিল না।
উপাচার্য ড. ফরিদুল ইসলাম এর আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চিত্র প্রদর্শনী প্রতিবাদের আরেকটি ভাষা এবং এই চিত্রকর্মগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কী বলছেন ছাত্র সংগঠনের নেতারা
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (রাবি শাখা আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল) বলেছেন, ‘একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রবণতা জনগণের ঐক্য নষ্ট করে। এতে পরাজিত শক্তিগুলোরই লাভ হয়।’
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (রাবি শাখা সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী) বলছেন, ‘১৯৭১ আমাদের মূল ইতিহাস। ২০২৪ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও একাত্তরকে খাটো করে চব্বিশ বড় হয় না। একটি ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠা করতে আরেকটি ইতিহাসকে অপমান করার প্রয়োজন নেই।’
ইসলামী ছাত্রশিবির (রাবি শাখা সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান) বলছে, ‘একাত্তর ও চব্বিশ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনা। আমরা দুটিকে মুখোমুখি করতে চাই না; বরং উভয়ের প্রেরণাকে ধারণ করে এগিয়ে চাই।’
ইতিহাসের আলোকে মূল মূল্যায়ন
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় অস্তিত্বের সঙ্গে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ একটি নির্দিষ্ট সময়ের সংগ্রাম নয়; এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্মসনদ এবং সমস্ত গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ভিত্তিপ্রস্তর।
পক্ষান্তরে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে ফ্যাসিবাদী জাঁতাকল থেকে মুক্তি ও রাষ্ট্র সংস্কারের এক রক্তক্ষয়ী ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কিন্তু ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার বিচারে ১৯৭১ এবং ২০২৪ এক সমতলে অবস্থান করে না।
১৯৭১ হলো জাতির ভিত্তি—যার ওপর পরবর্তী সব রাজনৈতিক ও সামাজিক অর্জনের ইমারত নির্মিত হয়েছে। ফলে একটি শিল্পকর্মে বা তাত্ত্বিক আলোচনায় এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনাকে দাঁড়িপাল্লার দুই দিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তুলনামূলক ভারী বা হালকা দেখানোর প্রচেষ্টা ইতিহাসের কাঠামোগত বাস্তবতার সঙ্গে অসংগত।
একটি আন্দোলনকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে বাঙালির মূল ভিত্তি তথা একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামকে খাটো করা বা গৌণ করে দেখানো কেবল ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ নয়, বরং এটি জাতীয় ঐক্যে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা বৈকি। একইসঙ্গে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক প্রদর্শনীতে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয় যাচাই না করে স্থান দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দৈন্যকেই স্পষ্ট করে তোলে।
ঐতিহাসিক ক্রমধারা ও ভিত্তির প্রশ্ন
ইতিহাসবিদদের মতে, যেকোনো জাতির রাষ্ট্রীয় ও ভূখণ্ডগত অস্তিত্বের একটি মৌলিক ভিত্তি থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ হলো সেই ভিত্তিপ্রস্তর, যার ওপর দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এই সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ফলে ইতিহাসবিদরা সাধারণত যেকোনো নতুন রাজনৈতিক বা গণঅভ্যুত্থানকে (যেমন—১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান বা ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থান) একাত্তরের ভিত্তির ওপর রচিত পরবর্তী ঐতিহাসিক মাইলফলক বা ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখে থাকেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৭১ সালের একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, পরিসর ও চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। একটিকে অন্যটির প্রতিপক্ষ বা দাঁড়িপাল্লার দুই প্রান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ। কারণ, একাত্তরের বিজয় ছাড়া চব্বিশের এই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত্র বা মুক্ত পরিবেশ অর্জিত হতো না।
পণ্ডিত ও গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইতিহাসকে খণ্ডবিখণ্ড করে দেখার বা মুখোমুখি দাঁড় করানোর একধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা সমাজে ও রাষ্ট্রে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন তৈরি করে। ইতিহাসকে তার সঠিক কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতা এবং পারস্পরিক পরিপূরক সম্পর্কের আলোকেই মূল্যায়ন করা উচিত, কোনো প্রতিযোগিতায় বা পাল্লায় মাপা উচিত নয়।
নিউজ নাউ বাংলা/ কেএ/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১০ আগস্ট ২০২৬



