রাখাইন সমীকরণ ঘিরে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নতুন মোড়
কনফেডারেল মডেলই হতে পারে স্থিতিশীলতার নতুন দুয়ার

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে মিয়ানমারের রাজনৈতিক মানচিত্র এখন নতুন রূপ নিচ্ছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা রাখাইনের এক নতুন রাজনৈতিক-সামরিক বাস্তবতা।
২০২৪ সালের শেষ নাগাদ নিজেদের সীমানা সুসংহত করার পর আরাকান আর্মি (AA) কেবল একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজস্ব আহরণ, নিজস্ব প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা ও ব্যাংকিং অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি ‘ডি-ফ্যাক্টো’ রাষ্ট্র গঠনের পথে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ, চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তিসমূহ যদি পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের একটি সম্মানজনক ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে পারে, তবে রাখাইনের এই কনফেডারেল মডেলই হতে পারে মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার এক নতুন উদীয়মান দুয়ার।
আরাকান আর্মির এই কৌশলগত উত্থান মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধকে একটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক দাবার চালের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে রাখাইন অঞ্চলের ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ এখন মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অন্যতম নিয়ামক হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্র গঠনের দিকে অগ্রসর আরাকান আর্মি
ঐতিহ্যবাহী গেরিলা যুদ্ধের গণ্ডি পেরিয়ে আরাকান আর্মি নিজেদেরকে একটি টেকসই প্রশাসনিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। জান্তা সরকারের ‘কিয়াত’ মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমাতে তারা নিজস্ব রাজস্ব মডেল তৈরি করছে। সম্প্রতি চালু করা ‘লাওং পাও’ লটারি ও স্থানীয় কর ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্জিত অর্থের বড় একটি অংশ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করার ঘোষণা দিয়ে তারা একটি প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করাচ্ছে।
আরাকান আর্মির প্রধান জেনারেল তুন মিয়াৎ নাইং (Tun Myat Naing) একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য মিয়ানমারের ভেতরে একটি “কনফেডারেট স্টেট” গঠন করা (যেমনটি ওয়া স্টেট বা Wa State চালাচ্ছে)। তার এই কাঠামোর আওতায় রাখাইনের খনিজ সম্পদ, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নিরাপত্তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাদের হাতে, যা মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগত অঞ্চলের জন্যও একটি নতুন রাজনৈতিক মডেল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত সংযোগ ও অবস্থান
রাখাইনের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেশী ও বড় শক্তিগুলো নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জায়গা থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
বাংলাদেশের সুদৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান
রাখাইনের স্থিতিশীলতার সাথে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন সরাসরি জড়িত। বাংলাদেশ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বড় দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের শান্তি রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। আঞ্চলিক যেকোনো উন্নয়ন বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানকে বাংলাদেশ প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে রাখছে।
চীনের কৌশলগত বিনিয়োগ
রাখাইনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক করিডোর সুরক্ষা করা চীনের মূল লক্ষ্য। এর ফলে তারা স্থানীয়ভাবে কার্যকর শক্তির সাথে যোগাযোগ বজায় রেখে নিজেদের ‘বিআরআই’ (BRI) প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে চায়।
ভারতের অবকাঠামোগত স্বার্থ: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে সরাসরি সংযোগকারী ‘কালাদান প্রজেক্ট’-এর নিরাপত্তা রক্ষা করা নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তারাও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে।
রোহিঙ্গা সংকট: অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের মূল পরীক্ষা
সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য সত্ত্বেও আরাকান আর্মির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হলো রাখাইনে বসবাসরত সব জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। বুথিডং ও মংডুতে রোহিঙ্গা জনগণের ওপর হামলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আরাকান আর্মি যদি নিজেদের আন্তর্জাতিকভাবে একটি গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই রোহিঙ্গাদের পূর্ণ অধিকার ও নিরাপদ পুনর্বাসনের পথ সুগম করতে হবে। কারণ বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে যেকোনো আঞ্চলিক শাসনের বৈধতা নির্ভর করবে মানবিক অঙ্গীকার পূরণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণের ওপর।
ভবিষ্যৎ পথরেখা: সহযোগিতার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা
মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকায় দেশটি কার্যত বেশ কিছু স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে রূপ নিতে যাচ্ছে। তবে রাখাইন রাজ্য একটি উন্নত, অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠবে নাকি স্থায়ী অস্থিতিশীলতায় আটকে থাকবে—তা নির্ভর করছে একটি বড় সত্যের ওপর:
আরাকান আর্মি কি রোহিঙ্গা সংকট নিরসন করে আঞ্চলিক পরাশক্তি ও প্রতিবেশীদের সাথে শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির টেকসই অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে?
নিউজ নাউ বাংলা/ কেএ/ ২২ জুলাই ২০২৬



