পেট ভরলেও পুষ্টি কম: খাবার টেবিলের নতুন সংকট

দৈনন্দিন খাবারের থালা হয়তো খালি থাকছে না, কিন্তু তাতে শরীর গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকছে তো? জাতিসংঘের এক যৌথ প্রতিবেদনের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের কাছে এই প্রশ্নটি কেবল স্বাস্থ্যের নয়, বরং পকেটেরও।
দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশের এক বড় অংশের মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়ছে দুধ, ডিম, মাছ, মাংস ও ফলের মতো দরকারী উপাদানগুলো।
ভোর ছয়টায় কারওয়ান বাজারের গলিতে যখন আড়তে সবজির ট্রাক নামছে, তখন ৫০ বছর বয়সী রাজ্জাক মিয়ার পকেটে চারটে ভাঁজ করা নোট। দিনের প্রথম আলু আর চাল কিনে বাজার থেকে বের হতে হতেই হিসেব মেলানো শেষ। বাজারের ব্যাগে চাল আছে, ডালও আছে, কিন্তু আজকেও নেই কোনো মাছ বা মাংসের টুকরো। এক ফালি লাল শাক হয়তো আছে, কিন্তু তিন সন্তানের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে যে রঙিন ফলমূল কিংবা এক গ্লাস দুধ দরকার—তা যেন রাজ্জাক মিয়ার কাছে দূর আকাশের তারা।
রাজ্জাক মিয়ার এই থলেটি কেবল একটি পরিবারের গল্পের প্রতিচ্ছবি নয়; এটি এখন বাংলাদেশের প্রায় পৌনে সাত কোটি মানুষের দৈনন্দিন এক নিঃশব্দ লড়াই। যে লড়াইয়ে পেট হয়তো ভরছে শর্করা দিয়ে, কিন্তু থালা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের আসল শক্তি—পুষ্টি।
পুষ্টির থালায় খরচের চাবুক
জাতিসংঘের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক করুণ সত্য। দেশের প্রায় ৩৮.৬ শতাংশ মানুষ—সহজ কথায়, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দুজন—প্রতিদিনের পুষ্টিকর খাবার কিনে খাওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত পাকিস্তানের পরই পুষ্টি সংকটের এই দৌড়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।
খাবারের বাজারে প্রতিদিন যে নীরব আগুন জ্বলছে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে একজন মানুষের দৈনন্দিন ন্যূনতম স্বাস্থ্যকর খাবারের পেছনে খরচ হতো প্রায় ৩.০৯ ডলার (পিপিপি)। কিন্তু আজ সেই খরচ লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৫৯ ডলারে। চাল বা ভাতের দাম হয়তো কোনোমতে সামলানো যাচ্ছে, কিন্তু স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় থাকা বাকি পাঁচ সদস্য—আমিষ, ফল, শাকসবজি, বীজ এবং তেলের পেছনেই চলে যাচ্ছে সিংহভাগ টাকা।
অপ্রিয় হলেও সত্য, শাকসবজি ও আমিষের মতো প্রয়োজনীয় খাবারগুলো আজ অনেক পরিবারের খাদ্যতালিকা থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়েছে।
অদৃশ্য দেওয়াল ও বিশ্ববাজারের ফাঁদ
কিন্তু কেন এই দূরবস্থা? আয় বাড়লেও সাধারণ মানুষ পুষ্টিকর খাবার পাতে তুলতে পারছে না কেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. রুহুল আমিনের কথায় মিলল সেই জটিল অংকের হিসেব। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম এক লাফ দিলে দেশের বাজারে তার আঁচ পড়ে মুহূর্তের মধ্যে। কিন্তু বিশ্ববাজারে সেই দাম যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকে, দেশের স্থানীয় বাজারে তখন নেমে আসে এক রহস্যময় স্থবিরতা—দাম আর সহজে কমে না।
ফলে সামান্য আয়ের বৃদ্ধিতে যে আশার আলো জ্বলেছিল, তা চড়া পণ্যের বাজারের কাছে হেরে যায়। প্রোটিনের মূল উৎস মাছ, মাংস, ডিম বা দুধ চলে যাচ্ছে সাধারণ নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে।
বৈশ্বিক অন্ধকার ও উত্তরণের আলো
সমস্যাটা অবশ্য কেবল আমাদের ঘরের নয়। গোটা পৃথিবীতে প্রায় ২৬৯ কোটি মানুষ আজ স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাড় করতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছেন। তবে সমস্যার রূপ জানা থাকলে সমাধানের পথও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ এই সংকট থেকে বের হওয়ার কিছু স্পষ্ট নকশা এঁকে দিয়েছে।
সংস্থাটির পরামর্শ হলো-খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় যে মধ্যস্বত্বভোগী ও অপ্রয়োজনীয় খরচের দেয়াল আছে, তা ভেঙে ফেলতে হবে। পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি আধুনিক হিমাগার তৈরি করতে হবে, যাতে এক কড়ি সবজিও পচে নষ্ট না হয়। সিন্ডিকেটের হাত থেকে রক্ষা পেতে সঠিক তথ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এবং মাঠ থেকে থালা পর্যন্ত খাদ্যের অপচয় বন্ধে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষুধা মেটানো আর শরীরকে পুষ্টি দেওয়া—দুটি এক কথা নয়। সস্তা শর্করা খেয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু একটি শক্তিশালী, সুস্থ ও মেধাবী জাতি গড়ে তোলা যায় না। রাজ্জাক মিয়ার মতো কোটি কোটি মানুষের থালায় পুষ্টির যোগান দেওয়াটা আজ কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার লড়াই। সেই লড়াইয়ে আমরা কবে জিতব—তা এখন পুরো ব্যবস্থার সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে।
নিউজ নাউ বাংলা/ কেএ/ ২২ জুলাই ২০২৬



