
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা একটা সাধারণ সাইবেরিয়ান ফ্রন্টাল পাখির ডানা মোচড়ানো কিংবা কোনো বিরল চিলন বকের জলকেলির দৃশ্য—সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের কাছে এগুলো হয়তো শুধুই কয়েক হাজার ‘লাইক’ আর ‘রিঅ্যাক্ট’-এর খোরাক।
কিন্তু বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পরিবেশবিদের কাছে এই একেকটি পিক্সেল হলো পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ‘লাইভ ডেটা স্ট্রিম’। নাগরিক বিজ্ঞানের (Citizen Science) এই যুগে লেন্সের সামান্য স্ন্যাপশট দেখে বিজ্ঞানীরা ট্র্যাক করেন গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের গ্রাফ, অনুমান করেন প্রজাতির অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার গতিপথ।
কিন্তু ভাবুন তো, আপনার ক্যানভা বা চ্যাটজিপিটির এক ক্লিকে পাখিটির গাঢ় নীল ডানা যদি হয়ে যায় বিরল কোনো এশিয়ান ভ্যারিয়েন্টের রঙ? কিংবা ব্যাকগ্রাউন্ডের অপ্রয়োজনীয় ডালপালা সরাতে গিয়ে এআই যদি পাখিটির ঠোঁটের গড়নটাই বদলে দেয়?
আজকের জেনারেটিভ এআই-এর যুগে ঠিক এই অদৃಶ್ಯ ডিজিটাল সাইবার-ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বিশ্ব পরিবেশ গবেষণা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত তথাকথিত ‘পারফেকশন’-এর ধাক্কায় দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে লেন্সের ওপাশের প্রকৃত বাস্তুসংস্থানের নিখাদ সত্য।
সংবাদটি সম্প্রতি বিজ্ঞানবিষয়ক বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ‘নেচার’ (Nature)-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইয়ের মতো জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্তমানে খুব সহজেই ছবির রূপ বদলে ফেলা যাচ্ছে।
আলোকচিত্রীরা হয়তো কেবল ফ্রেম সুন্দর করতে পেছনের ডালপালা মুছে ফেলছেন বা পাখির গায়ের রঙ কিছুটা উজ্জ্বল করছেন। কিন্তু এই সামান্য পরিবর্তনের খেসারত দিতে হচ্ছে বিজ্ঞানকে। অ্যালগরিদম অনেক সময় অজান্তেই একটি সাধারণ পাখির গায়ে যুক্ত করে দিচ্ছে অন্য প্রজাতির বৈশিষ্ট্য!
ব্রাজিলে এক আলোকচিত্রী সাধারণ একটি পাখির ছবি এআই দিয়ে এডিট করার পর দেখা যায়, অ্যালগরিদমের কল্যাণে সেটি হয়ে গেছে উত্তর আমেরিকার ‘রেড-উইংড ব্ল্যাকবার্ড’। ফলাফল? ওই অঞ্চলে যে পাখি কখনোই উড়েনি, বিজ্ঞানের খাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাম উঠে গেল!
বর্তমানে ‘আইন্যাচারালিস্ট’ (iNaturalist) বা ‘ম্যাকোলে লাইব্রেরি’-র মতো ‘সিটিজেন সায়েন্স’ প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের তোলা ৬১ কোটিরও বেশি ছবি জমা আছে। এই রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবহার করেই পরিবেশবিদরা বের করেন—
কোনো প্রজাতি নতুন এলাকায় বসতি গড়ছে কি না, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভিদে অকালেই ফুল ফুটছে কি না, বিরল প্রাণীর বিচরণক্ষেত্র আগের চেয়ে সংকুচিত হচ্ছে কি না।
নেচার-এর গবেষণাটির প্রধান লেখক ও ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির বাস্তুসংস্থানবিদ ড. আলেকজান্ডার লিস স্পষ্টই বলেছেন, সম্পূর্ণ ভুয়া ছবি সহজে চেনা যায় (যেমন সাইবেরিয়ায় ময়ূরের ছবি কেউ বিশ্বাস করবে না)। কিন্তু আসল বিপত্তি বাঁধায় ‘সুন্দর করতে গিয়ে এডিট করা’ ছবিগুলো।
ইতোমধ্যেই আইন্যাচারালিস্টের মতো নির্ভরযোগ্য ডেটাবেসে প্রায় ১,৪০০টি এআই-সম্পাদিত ছবি চিহ্নিত করা গেছে, যা গবেষকদের কপালে চিন্তার ভাজ ফেলছে।
গবেষকদের মতে, ছবি শেয়ারকারীদের উদ্দেশ্য সবসময় খারাপ থাকে না; বেশিরভাগই নিখুঁত ও নান্দনিক ছবি উপস্থাপন করতে চান। কিন্তু এই তথাকথিত ‘নিখুঁত ছবির’ মোহে পড়ে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কাজ করা পরিবেশবিদদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে।
প্রকৃতিকে তার নিজস্ব রূপেই দেখতে চান বিজ্ঞানীরা—কোনো কৃত্রিম অলংকরণে নয়। তাই এআই-এর এই যুগে ডিজিটাল পিক্সেলের ভিড়ে প্রকৃতির নিখাদ ও অকৃত্রিম সত্যটুকু টিকিয়ে রাখাই এখন বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিউজ নাউ বাংলা/ কেএ/ ২২ জুলাই ২০২৬



