আইন পাশের ৩ বছরেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি হোমিওপ্যাথি কাউন্সিল
থমকে আছে উন্নয়ন, ফেরত যাচ্ছে বরাদ্দ: নীতিনির্ধারকদের গড়িমসি, সংকটে হোমিও চিকিৎসা শিক্ষা

কে.এ সুমন চৌধুরী, ঢাকা: ‘বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন-২০২৩’ পাশের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো গঠন করা সম্ভব হয়নি বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের (বিএইচএমইসি) পূর্ণাঙ্গ গভর্নিং বডি ও নির্বাহী পরিষদ।
ফলে মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ও শিক্ষার উন্নয়ন। থমকে আছে নতুন গাইডলাইন প্রণয়ন, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অনুমোদনসহ গুরুত্বপূর্ণ সব কার্যক্রম।
পাশাপাশি চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবার মান, দেশজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ভুয়া বা হাতুড়ে চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য। সংকট নিরসনে দ্রুত আইনি জটিলতা কাটিয়ে কাউন্সিলকে কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফেরত যাচ্ছে বরাদ্দ
জানা যায়, মান্ধাতা আমলের ‘বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক প্র্যাক্টিশনার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৩’ বাতিল করে যুগোপযোগী ধারায় ২০২৩ সালের নভেম্বরে জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা বিল’ পাশ হয়। কিন্তু আইন পাশের ৩ বছর পার হলেও বিএইচএমইসির পূর্ণাঙ্গ গভর্নিং বডি ও নির্বাহী পরিষদ গঠিত হয়নি।
নীতি-নির্ধারকদের এই দীর্ঘসূত্রতা ও গড়িমসির কারণে হোমিও চিকিৎসা ও শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের বরাদ্দ করা অর্থ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতি বছরই অর্থ ফেরত যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত বছর ৮৪ লাখ এবং চলতি বছরেও ১০ লাখ টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় কোষাগারে ফেরত গেছে।

স্থবির কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম
নতুন আইনে বিএইচএমইসির গভর্নিং বডি ও নির্বাহী পরিষদের জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। কিন্তু পরিষদ না থাকায় এর সবই এখন স্থবির। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় স্নাতকোত্তর, বিএইচএমএস এবং ডিএইচএমএস ডিগ্রিধারীদের চিকিৎসক নিবন্ধন দেওয়া, দেশি-বিদেশি কোর্সের স্বীকৃতি প্রদান এবং পেশাগত মান উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
ডিপ্লোমাসহ পেশাগত সনদ দেওয়া, দেশি-বিদেশি হোমিওপ্যাথিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি প্রদান এবং মূলধারার চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মেডিকেল কোর্সের সঙ্গে হোমিওপ্যাথিক শিক্ষার সমন্বয় সাধন। বর্তমানে এই দুই পর্ষদ অকার্যকর থাকায় উচ্চশিক্ষা, বিদেশি শিক্ষার্থীদের কোর্সের স্বীকৃতি এবং নতুন গবেষণার দ্বার কার্যত রুদ্ধ হয়ে আছে।
হতাশ ও ক্ষুব্ধ চিকিৎসক সমাজ
কাউন্সিলের অচলাবস্থা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর নেতারা। সম্মিলিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক জোটের আহ্বায়ক ডা. মো. আরিফুর রহমান মোল্লা জানান, আগের হোমিওপ্যাথিক বোর্ডের মতো প্রতিটি বিভাগে শিক্ষক ও চিকিৎসক প্রতিনিধি নির্বাচনের নিয়ম থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
তিনি বলেন, সব বিভাগে অন্তত একটি করে সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ স্থাপনের কথা থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এমন প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা ব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষায় কাউন্সিলকে শক্তিশালী করে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ গভর্নিং বডি ও নির্বাহী পরিষদ গঠন অত্যন্ত জরুরি।
শহীদ জিয়া হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. এম এম লিটন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আইনটি পাশ হওয়ার পর আমরা চিকিৎসক-শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হোমিও চিকিৎসা শিক্ষার অভাবনীয় উন্নতির আশা করেছিলাম, কিন্তু দীর্ঘ তিন বছরেও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।”

ডিএইচএমএস হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এই খাতের আধুনিকায়নে প্রতিবেশী দেশের উদাহরণ টেনে বলেন, “পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ‘আয়ুষ’ (AYUSH) নামে আলাদা মন্ত্রণালয় রয়েছে। আমাদের দেশেও অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার (এএমসি) অধিদপ্তর গঠন করে পৃথক মন্ত্রণালয় করা গেলে হোমিও চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন গতি আসবে।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও আইনি জটিলতা
কাউন্সিলের বর্তমান অচলাবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হোমিও ও দেশজ) ও কাউন্সিলের অস্থায়ী নিবন্ধক ডা. ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “যেসব হোমিওপ্যাথিক গ্র্যাজুয়েট আবেদন করছেন, তাদের রুটিনমাফিক রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হচ্ছে। তবে বড় সিদ্ধান্তগুলোর জন্য পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রয়োজন। সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত হলে শূন্য পদগুলোতেও দ্রুত জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, নির্বাচন আটকে থাকার বিষয়ে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নূর-ই-আলম সিদ্দিকী আইনি বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “নির্বাহী পরিষদ ও গভর্নিং বডি নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি আমরা সম্পন্ন করেছিলাম। এমনকি আটটি বিভাগ থেকে প্রতিনিধি নির্বাচনের তারিখও চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ আদালতের একটি স্থগিতাদেশের (স্টে অর্ডার) কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়া আটকে যায়।”
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আদালতের এই আইনি জটিলতা দ্রুত নিরসন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নিয়ে আইনটি পাশ হয়েছিল, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২৬ জুলাই ২০২৬



