Leadবাংলাদেশ

দ্বিতীয় নারী কেলেঙ্কারিও ফাঁস, এমপি পদ বাতিলের দাবি সর্বমহলে

◉ দলীয় বহিষ্কার বনাম সংসদীয় পদ

◉➤ নৈতিক স্খলনের দায়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। আর এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি সরল অঙ্কের জন্ম হয়েছে—দল যেহেতু নেই, তার সংসদ সদস্য পদটিও কি তবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে?

সাধারণ মানুষ হয়তো আবেগ বা নৈতিকতার মানদণ্ড দিয়ে বিচার করতে পছন্দ করে, কিন্তু সংসদ চলে সংবিধান দিয়ে। আর নিরেট সাংবিধানিক বাস্তবতা হলো, শুধু দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার কারণেই কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না।

এদিকে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এমপি নজরুলের আরও একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, এক নারীকে নিয়ে আবাসিক হোটেলের অভ্যর্থনা থেকে রুমে ঢুকছেন। সিঁড়ি বা লিফটেই ওই নারীকে জড়িয়ে ধরছেন! রুমে ঢোকার আগেই তিনি উত্তেজিত হচ্ছেন!

দ্বিতীয় নারী কেলেঙ্কারির ঘটনাটি ফাঁস হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন মহল থেকে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। অনেকে বলছেন, একজন আইন প্রণেতার চরিত্র এতটা জঘন্য হতে পারে না! তিনি এমপি পদে থাকার নৈতিক যোগ্যতা হারিয়েছেন!

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নিজ দল থেকে ‘পদত্যাগ’ করলে অথবা সংসদে ‘দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট’ দিলে তার আসন শূন্য হবে। আইন ও সংবিধানের ভাষায় ‘দল থেকে বহিষ্কার’ এবং ‘স্বেচ্ছায় দলত্যাগ’ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।

দল হয়তো তার দায় নিচ্ছে না এবং তাকে বের করে দিয়েছে, কিন্তু ওই সদস্য যদি নিজে থেকে পদত্যাগ না করেন এবং সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার মতো কাজ না করেন, তবে তার এমপি পদ সম্পূর্ণ বহাল থাকবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তফা শাকের উল্লাহও একই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়া, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা বা নৈতিক স্খলনের অভিযোগ ওঠা—এগুলোর কোনোটিই এমপি পদ বাতিলের সাংবিধানিক মাপকাঠি নয়।

তবে কি তার সংসদ সদস্য পদ চিরস্থায়ীভাবে সুরক্ষিত? বিষয়টি তেমনও নয়। পদ বাতিলের প্রশ্নটি তখনই প্রাসঙ্গিক হবে, যদি তিনি এই ঘটনায় কোনো ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হন। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দণ্ডিত হলে তিনি এমপি থাকার অযোগ্য হবেন। তখন আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্ন উঠলে ৬৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিষয়টি রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।

সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিও এখনই কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে নারাজ। তিনি মনে করেন, ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত নয় এবং এটি ষড়যন্ত্রের অংশও হতে পারে। আদালতে অপরাধী সাব্যস্ত হলেই শুধু নির্বাচন কমিশন পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাস ঘাঁটলে দলীয় বহিষ্কারের পর এমপি পদ থাকা বা না থাকার উভয় নজিরই পাওয়া যায়। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকী দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছিল।

অন্যদিকে, নবম জাতীয় সংসদে কাকতালীয়ভাবে এই সাতক্ষীরা-৪ আসনেরই তৎকালীন এমপি এইচ এম গোলাম রেজাকে জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু সে সময় প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় তার এমপি পদ বহাল ছিল।

সুতরাং, গাজী নজরুল ইসলামের সংসদীয় ভবিষ্যৎ আপাতত দুটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। হয় তিনি নৈতিক দায়ভার নিয়ে নিজে থেকে পদত্যাগ করবেন, যার ফলে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হবে এবং নিয়ম অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

আর তা না হলে, আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন। এই দুই শর্তের কোনোটি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত, সামাজিক মাধ্যমের কাঠগড়ায় তিনি যতই অপরাধী হোন না কেন, জাতীয় সংসদে তিনি একজন বৈধ সংসদ সদস্য হিসেবেই নিজের চেয়ারে বহাল থাকছেন।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২৩ জুলাই ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button