
◉➤ যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীসহ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য মার্কিন ভিসানীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। সাম্প্রতিক এই ঘোষণা মূলত শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সময়সীমা ও প্রক্রিয়াকে আরও কঠোরতর করে তুলেছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নতুন নিয়ম নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একদিকে যেমন উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে বিশ্লেষকরা একে দেখছেন ‘ভিসার অপব্যবহার রোধ’ এবং আসন্ন নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করার একটি কৌশল হিসেবে।
পরিবর্তনের মূল দিকগুলো
নতুন নীতিমালায় বেশ কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ বিলুপ্তি: আগে বিদেশি শিক্ষার্থীরা তাদের ডিগ্রি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশটিতে থাকার অনুমতি পেতেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার পরিবর্তে সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত অবস্থানের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ: এতদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত কর্মকর্তা বা ডিএসও’দের হাতে সময় বাড়ানোর যে ক্ষমতা ছিল, তা কমিয়ে এখন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সংস্থা ইউএসসিআইএস (USCIS)-এর নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, নির্ধারিত চার বছরের বেশি সময় থাকতে চাইলে এখন থেকে প্রতিবারই ফেডারেল সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
সংকুচিত গ্রেস পিরিয়ড: কোনো শিক্ষার্থী কোর্স সম্পন্ন করার পর বৈধভাবে দেশ ছাড়ার বা অন্য ভিসায় পরিবর্তনের জন্য আগে ৬০ দিন সময় পেতেন। নতুন নিয়মে এই ‘গ্রেস পিরিয়ড’ কমিয়ে মাত্র ৩০ দিন করা হয়েছে।
পরিবর্তনশীল নিয়ম: একাডেমিক কার্যক্রম বা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তনের সুযোগও আগের চেয়ে সংকুচিত করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পিএইচডি ও দীর্ঘমেয়াদী কোর্সে অনিশ্চয়তা
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হতে পারেন পিএইচডি বা দীর্ঘমেয়াদী গবেষণারত শিক্ষার্থীরা। অনেক ক্ষেত্রেই গবেষণার জটিলতা বা অর্থায়নের কারণে এ ধরনের কোর্সে চার বছরের বেশি সময় প্রয়োজন হয়। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশেই সময় বাড়ানো সম্ভব হতো, কিন্তু এখন কেন্দ্রীয় পর্যালোচনার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা গবেষণার ধারাবাহিকতায় অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতামত ও রাজনৈতিক সমীকরণ
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি আইনজীবী রাজু মহাজনের মতে, যারা প্রকৃত শিক্ষার্থী এবং নিয়মিত পড়াশোনা করছেন, তাদের জন্য এই পরিবর্তন হয়তো বড় কোনো বিপর্যয় ডেকে আনবে না, তবে প্রশাসনিক জটিলতা নিশ্চিতভাবেই বাড়বে।
তার মতে, নভেম্বরের নির্বাচনকে সামনে রেখে রিপাবলিকান পার্টির ভোটারদের তুষ্ট করার একটি প্রয়াস হিসেবেই এই কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, অতীতেও এমন অনেক নীতি আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তাই নতুন এই বিধিনিষেধের প্রয়োগ শেষ পর্যন্ত কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া: আতঙ্ক না সতর্কতা?
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে পড়াশোনারত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একাংশ মনে করছেন, যারা পড়াশোনার চেয়ে ভিসার স্ট্যাটাস ধরে রাখার প্রবণতা বেশি দেখাতেন, এই নীতি মূলত তাদের জন্যই একটি সতর্কবার্তা। আবার অনেকে মনে করছেন, বারবার নিয়ম পরিবর্তন করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও সতর্কতা
সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নীতিমালার প্রভাবে পড়াশোনার পর ওপিটি (OPT) বা চাকরির বাজারেও সময়ের সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে। এমতাবস্থায়, শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ হলো:
১. একাডেমিক নথি: নিজের প্রোগ্রামের মেয়াদ ও প্রয়োজনীয়তার স্বপক্ষে সব নথিপত্র যথাযথভাবে প্রস্তুত রাখা।
২. বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা: যেকোনো একাডেমিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রবিষয়ক দপ্তরের সাথে পরামর্শ করা।
৩. সতর্ক নজরদারি: মার্কিন প্রশাসনের এই নীতিমালার পরবর্তী নির্দেশনা ও আইনি চ্যালেঞ্জের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা।
পরিশেষে, মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপটি শিক্ষার্থীদের ওপর একটি প্রশাসনিক চাপ তৈরি করলেও, বৈধ শিক্ষার্থীদের জন্য এটি কেবলই প্রক্রিয়ার পরিবর্তন। তবে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং নিজের একাডেমিক পরিকল্পনাকে নথিপত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা এখন প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সময়ের দাবি।সূত্র: বিবিসি বাংলা
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১৯ জুলাই ২০২৬



