Leadএনএনবি বিশেষবাংলাদেশ

মশার দখলে ঢাকা, ‘কাগুজে’ তৎপরতা সিটি করপোরেশনের

◉ দিনে মশারি, রাতে আতঙ্ক

◉➤ টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় রাজধানী ঢাকা যেন মশার অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, দিনের বেলাতেও অনেক এলাকার বাসিন্দাদের মশারির নিচে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। ঘরে ঘরে বাড়ছে ডেঙ্গু আতঙ্ক। অথচ মশক নিধনে দুই সিটি করপোরেশনের তৎপরতা শুধু আশ্বাস আর অজুহাতেই সীমাবদ্ধ।

সম্প্রতি সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানালেও, খোদ রাজধানীতেই মশা নিধনে জোরালো কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, বসিলা, বেড়িবাঁধ থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও কড়াইল বস্তির মতো এলাকাগুলো এখন মশার হটস্পট।

ধূপ-কয়েলেও হার মানছে মশা
মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার ও বসিলা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মশা তাড়াতে দিন-রাত কয়েল ও ধূপ জ্বালিয়েও কোনো কূল পাচ্ছেন না বাসিন্দারা। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার গৃহিণী বীথি আক্তারের কণ্ঠে চরম হতাশা, ‘দিন হোক বা রাত, মশার হাত থেকে আমাদের রেহাই নেই। ব্লিচিং পাউডার ও জীবাণুনাশক দিয়ে ঘরদোর বারবার পরিষ্কার করেও লাভ হচ্ছে না।’

অন্যদিকে, বসিলা এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ জাহিদুল ইসলাম টিপু জানান, ঘরে ছোট বাচ্চা থাকায় স্প্রের বদলে মশারিই তাদের ভরসা। তিনি বলেন, “মশারি ভেদ করে কীভাবে যেন মশা ভেতরে ঢুকে পড়ে, তাই বারবার আমাদের ঘুম ভেঙে যায়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ঘিঞ্জি কক্ষে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি
মশার উপদ্রব থেকে রেহাই পায়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো-ও। জহুরুল হক ও হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের শিক্ষার্থীরা জানান, একসঙ্গে কয়েকটি কয়েল জ্বালিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিভাগের শিক্ষার্থী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কক্ষগুলোতে এত বেশি শিক্ষার্থী থাকেন যে, অনেকের ঠিকমতো মশারি টাঙানোরও জায়গা থাকে না। কয়েলেও কাজ হচ্ছে না, সব জায়গায় শুধু মশা আর মশা।’ জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থী দেবাশীষ দাসের মতে, ১০ তলা ভবনের ছাদে গেলেও মশার হাত থেকে নিস্তার মিলছে না।

কড়াইল বস্তি: মশক নিধনেও ‘শ্রেণি-বৈষম্য’
রাজধানীর অভিজাত এলাকার তুলনায় নিম্ন আয়ের মানুষের এলাকাগুলো মশক নিধনে কতটা অবহেলিত, তার জ্বলন্ত প্রমাণ কড়াইল বস্তি। সরু গলি আর ঠাসাঠাসি ঘরের চারপাশে জমে থাকা বৃষ্টির পানি পরিণত হয়েছে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে। ভরদুপুরেও এখানকার পরিবারগুলোকে মশারির নিচে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়।

রিকশাচালক মোহাম্মদ সুমনের প্রশ্ন, ‘আমরা কী করব? সারাদিন তো কয়েল জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব না, আর এখানে কাউকে ওষুধ ছিটাতেও দেখি না।’ তার প্রতিবেশী ৬৮ বছর বয়সী রাহেলা বানুর অভিযোগ আরও তীক্ষ্ণ। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের কর্মীরা পাশের অভিজাত এলাকা বনানীতে নিয়মিত ওষুধ ছিটায়, কিন্তু এখানে কেউ আসে না।’

কর্তৃপক্ষের বয়ান: অজুহাত ও নীরবতা
জনগণের এই চরম দুর্ভোগের বিপরীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) দাবি, তাদের কার্যক্রম অব্যাহত আছে। ডিএনসিসির জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ লুৎফর রহমান জানান, ডেঙ্গু মৌসুমের আগেই একটি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করা হয়েছে।

তবে ভারী বর্ষণের কারণে রুটিন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কথা স্বীকার করে ডিএনসিসির উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক জানান, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তাদের একটি বিশেষ অভিযান চলবে। যদিও কড়াইল বস্তির বাসিন্দা সুমনের আক্ষেপ, ‘আমরা শুনছি অভিযান চলছে। কিন্তু মশা তো আগের মতোই রয়ে গেছে।’

সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি)। জরুরি পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম ‘মিটিংয়ে আছেন’ জানিয়ে কল কেটে দেন। আর জনসংযোগ কর্মকর্তা রাসেল রহমান শনিবার সরকারি ছুটির অজুহাত দেখিয়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন, ভারী বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি এডিস মশার জন্য আদর্শ প্রজনন পরিবেশ। এখনই সিটি করপোরেশন তাদের দৃশ্যমান তৎপরতা না বাড়ালে, মশার এই উপদ্রব অচিরেই এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২০ জুলাই ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button