Leadবাংলাদেশ

ভূমি সংকট: পাহাড়ে দ্বৈত ব্যবস্থাপনার গোলকধাঁধা

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কি হারিয়ে যাবে বন ও বনবাসী?

জলবায়ু পরিবর্তনের তাণ্ডব যখন পৃথিবীকে গ্রাস করতে উদ্যত, তখন বন জঙ্গলই আমাদের শেষ ভরসা—যাকে আমরা বলছি প্রকৃতির ‘ফুসফুস’। কিন্তু প্যারাডক্সটি হলো, যে মানুষগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরম মমতায় এই বনকে আগলে রেখেছে, তারাই আজ নিজেদের ভূমিতে ‘পরিচয়হীন’।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ে বন উজাড় হওয়ার হাহাকারের বিপরীতে সজীব থাকা ‘মৌজা বন’গুলো যেন এক নীরব সাক্ষ্য। কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যায়—আদিবাসীদের ভূমির আনুষ্ঠানিক অধিকার ছাড়া কি আমরা আদৌ বন বাঁচাতে পারব? নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হারিয়ে যাবে বন ও বনবাসী—উভয়ই?

১. আধুনিক বন ব্যবস্থাপনায় আদিবাসী প্রজ্ঞা: বৈশ্বিক গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে, স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হাতে থাকা বনভূমিগুলো অনেক বেশি সুরক্ষিত। রেইনফরেস্ট ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় বন উজাড়ের হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ২৬ শতাংশ কম।

অথচ আমাদের সরকারি সংরক্ষিত বনের অবস্থা করুণ। এর মূল কারণ—রাষ্ট্রীয় তদারকির সীমাবদ্ধতা। যখন একটি সম্প্রদায় বনকে তাদের বেঁচে থাকার অস্তিত্ব মনে করে, তখন তারা কোনো ‘প্রজেক্ট’ ছাড়াই তা রক্ষা করে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এই প্রজ্ঞার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই।

২. অর্থায়নের গোলকধাঁধায় অধিকারের সংকট: বন সুরক্ষার জন্য বৈশ্বিক তহবিলের অভাব নেই—১২৫ বিলিয়ন ডলারের ‘ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি’ (টিএফএফএফ)-এর মতো বড় উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু সংকটটা অন্যখানে। এসব তহবিল পায় তারাই, যাদের কাছে ভূমির আইনি মালিকানার দলিল আছে।

যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামের মৌজা বন বা প্রথাগত ভূমির অধিকাংশেরই রাষ্ট্রীয় কোনো কাগজ নেই, তাই আন্তর্জাতিক অর্থায়ন রাষ্ট্রের কোষাগারে আটকা পড়ে। অথচ শর্ত ছিল, এই অর্থের অন্তত ২০ শতাংশ সরাসরি স্থানীয়দের পাওয়ার কথা। ফলে, বন সুরক্ষা পায় না প্রয়োজনীয় রসদ, আর আদিবাসীরা পায় না তাদের অধিকার।

৩. দ্বৈত ব্যবস্থাপনার গোলকধাঁধা: পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনায় এক অদ্ভুত দ্বিমুখী নীতি বিদ্যমান। একদিকে ১৯০০ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রেগুলেশন, অন্যদিকে প্রথাগত হেডম্যান-কার্বারি প্রথা। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বের মাঝে পিষ্ট হয়ে আছে পাহাড়ের ভূমি। শান্তিচুক্তি হয়েছে অনেক বছর আগে, কিন্তু ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় আদিবাসীরা আজ নিজ ভূমিতে পরবাসী। রাষ্ট্রের কাছে যা ‘খাসজমি’, স্থানীয়দের কাছে তা ‘পূর্বপুরুষের ভিটা’। এই আইনি অস্পষ্টতাই বন ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করছে।

৪. উত্তরণের আধুনিক পথ: আইসিসিএ (ICCA) মডেল: আধুনিক বিশ্বে এখন ‘ইন্ডিজেনাস অ্যান্ড কমিউনিটি কনজার্ভড এরিয়াজ’ (আইসিসিএ) বা আদিবাসী ও স্থানীয় সংরক্ষিত অঞ্চলের ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটি এমন একটি মডেল যেখানে ব্যক্তিমালিকানার চেয়ে ‘সামষ্টিক অভিভাবকত্ব’-কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত পার্বত্য অঞ্চলের মৌজা বনগুলোকে আন্তর্জাতিক আইসিসিএ রেজিস্ট্রিভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া। এতে একদিকে যেমন বনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে, তেমনি সরাসরি অর্থায়নের পথ সুগম হবে।

২০২৫ সালের বননীতিতে মৌজা বনের স্বীকৃতির যে আশ্বাস মিলেছে, তা একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে কেবল নীতিমালার কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়তে হলে বন এবং বনবাসী—এই দুইয়ের সম্পর্কের সেতুবন্ধনটি আগে জোড়া লাগাতে হবে। বনের অধিকার আদিবাসীদের হাতে তুলে দেওয়াই হতে পারে আগামীর সবুজ পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

নিউজ নাউ বাংলা/ কেএ/ জেডআরসি/ ১৮ জুলাই ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button