Leadএনএনবি বিশেষবাংলাদেশ

‘ভিসা বাণিজ্যে’ ধুঁকছে শ্রম অভিবাসন

◉ ৪৯ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল, নতুন নিবন্ধন ২১৬

◉➤ বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে প্রতারণা, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং ভিসা বাণিজ্যের অভিযোগে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার। তবে একদিকে যখন অনিয়মের দায়ে লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে, অন্যদিকে চলতি বছরই নতুন করে নিবন্ধন পেয়েছে আরও ২১৬টি এজেন্সি।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা অস্বাভাবিক রকমের বেশি। যত্রতত্র লাইসেন্স প্রদান এবং সরকারের নজরদারির অভাবে এই খাতটি এখন মধ্যস্বত্বভোগী ও ভিসা ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গেছে।

শ্রমিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিবেশি দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকে তুলনামূলক বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে বাংলাদেশে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সবশেষ তথ্য মতে, দেশে রিক্রুটিং এজেন্সি ২ হাজার ৮৪১টি। এরমধ্যে সক্রিয় ২ হাজার ১৭৫টি ও লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২৯৭টির।

লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে বায়রার সদস্য প্রায় আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠান। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার তালিকাভুক্তির প্রতিযোগিতা থাকলেও অধিকাংশ এজেন্সি কাজ করে মূলত সাব এজেন্টের।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের সমন্বয়হীনতার কারণেই এজেন্সিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রতারণার এড়াতে কাজের মূল্যায়নের পাশাপাশি যত্রতত্র লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

লাইসেন্সধারী অনেক এজেন্সির বিরুদ্ধেও রয়েছে প্রতারণার ফাঁদ পাতার অভিযোগ। তাই মেয়াদ নবায়নের আগে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নিরাপদ শ্রম অভিবাসন ও কর্মীদের কাজের নিরাপত্তা দিতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে আরও বেশি জবাবদিহিতা ও নজরদারির আৱওতায় আনতে হবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাতিল হলো যাদের লাইসেন্স
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গত ১৯ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের আদেশ দেয়, যা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এসব এজেন্সির বিরুদ্ধে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ, ‘প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইন, ২০১৩’, ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) আইন ২০২৩’ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর বিভিন্ন ধারায় আদালতে অভিযোগপত্রও দাখিল হয়েছে।

লাইসেন্স আড়াই হাজার, কাজ করে অর্ধেকের কম
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ২ হাজার ৮৪১টি। এর মধ্যে সক্রিয় রয়েছে ২ হাজার ১৭৫টি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ২৯৭টির। তবে লাইসেন্সধারী এসব এজেন্সির অর্ধেকেরও কম সরাসরি শ্রম অভিবাসনে ভূমিকা রাখছে। বাকিরা মূলত ‘সাব-এজেন্ট’ বা ভিসা ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

এ প্রসঙ্গে ওয়্যারবী ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, ‘লাইসেন্স পেলেই যে প্রতিষ্ঠানগুলো নৈতিকতার সাথে কর্মী পাঠাবে, বিষয়টি তেমন নয়। অনেক এজেন্সি সরাসরি কর্মী পাঠায় না, বরং ভিসা কিনে এনে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে কাজ করে।’

বিষয়টি একপ্রকার স্বীকার করে নিয়েছেন বায়রার সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দেড় থেকে ২০০ এজেন্সি সৌদি আরবে সরাসরি রিক্রুটমেন্টের সাথে জড়িত। বায়রা একটি পরিবারের মতো। কারও কাছে কর্মীর ডিমান্ড এলে, পরিবারের সদস্য হিসেবে সবাই সেই ডিমান্ড পূরণে সহায়তা করে।’

প্রতিকারহীন প্রতারণা ও দায়সারা কর্তৃপক্ষ
সরকারের অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে গিয়েও বিদেশে কাজ না পাওয়া এবং প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এত বিপুল সংখ্যক এজেন্সিকে নজরদারির আওতায় আনা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির।

তিনি বলেন, ‘এজেন্সিগুলোর একটি মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। যারা খারাপ পারফর্ম করছে, তাদের কালো তালিকাভুক্ত করে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং নতুন অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ‘সরকারকে কঠোর হতে হবে। এক বছরে ন্যূনতম ১০০ জন কর্মী পাঠাতে না পারলে বা অভিযোগ থাকলে সেই এজেন্সির লাইসেন্স নবায়ন করা উচিত নয়। কাজ না করা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিলেই লাইসেন্সের সংখ্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে আসবে।’

তবে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএমইটি-র অবস্থান এখনো অনেকটাই অভিযোগ-নির্ভর। সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আশরাফ হোসেন বলেন, ‘রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গিয়ে কাজ না পাওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপদ শ্রম অভিবাসন নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগের জন্য অপেক্ষা না করে সংস্থাটির স্বপ্রণোদিত নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একনজরে লাইসেন্স বাতিল হওয়া ৪৯ প্রতিষ্ঠান:
ইউনিক ইস্টার্ন (প্রা.) লিমিটেড, অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ, এম/এস শাহীন ট্রাভেলস, ইরভিং এন্টারপ্রাইজ, হায়দরি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল, জাহরাত অ্যাসোসিয়েটস, ফোর সাইট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, এম/এস বিনিময় ইন্টারন্যাশনাল, আকাশ ভ্রমণ লিমিটেড, এম/এস কিউ.কে. কুইক এক্সপ্রেস লিমিটেড, ইউনাইটেড এক্সপোর্ট লিমিটেড, জিএমজি ট্রেডিং (প্রা.) লিমিটেড, সাদিয়া ইন্টারন্যাশনাল, দ্য সুপার ইস্টার্ন লিমিটেড, এলিগ্যান্টস ওভারসিজ লিমিটেড, এম/এস ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল,

মিডওয়ে ওভারসিজ লিমিটেড, মদিনা ওভারসিজ, আল-খামিস ইন্টারন্যাশনাল, নিউ এজ ইন্টারন্যাশনাল, দাহমাশি করপোরেশন লিমিটেড, গ্যালাক্সি করপোরেশন, সুলতান ওভারসিজ, প্রভাতী ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানিসপাওয়ার করপোরেশন, আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল, আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, দরবার গ্লোবাল ওভারসিজ, নাতাশা ওভারসিজ, অপরাজিতা ওভারসিজ, ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড,

স্ট্যানফোর্ড এমপ্লয়মেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড, জান্নাত ওভারসিজ, বিএম ট্রাভেলস লিমিটেড, বিএনএস ওভারসিজ লিমিটেড, রুবেল বাংলাদেশ লিমিটেড, অরবিটালস ইন্টারন্যাশনাল, ট্রান্স এশিয়া ইন্টিগ্রেটেড সার্ভিসেস লিমিটেড, আল ফারাহ হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড কনসালট্যান্সি, এম/এস স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেড, ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল, থানেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, জিজি আলফালাহ ম্যানেজমেন্ট, ইম্পেরিয়াল রিসোর্সেস লিমিটেড, পি.আর. ওভারসিজ লিমিটেড, এম/এস এমইএফ গ্লোবাল বাংলাদেশ লিমিটেড এবং অনন্য অপূর্ব রিক্রুটিং এজেন্সি।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২১ জুলাই ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button