Leadএনএনবি বিশেষ

আর্সেনিকের আড়ালে পানিতে ম্যাঙ্গানিজের থাবা, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বিশ্বভূগর্ভস্থ পানির বিষাক্ততা বলতে এতদিন আমাদের চোখে ভেসে উঠত আর্সেনিক, ফ্লোরাইড কিংবা নাইট্রেটের কথা। বছরের পর বছর ধরে এসব ক্ষতিকর উপাদান নিয়েই বিশ্বজুড়ে চলেছে গবেষণা ও প্রতিরোধমূলক নানা পদক্ষেপ। কিন্তু এই বহুল আলোচিত উপাদানগুলোর নেপথ্যে নীরবে রূপ নিচ্ছিল অন্য এক ভয়ংকর বিপর্যয়।

সুইজারল্যান্ডের পানিবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক ফেডারেল ইনস্টিটিউটের (Eawag) সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে সেই অপ্রিয় সত্য—মাটির গভীরের পানিতে লুকিয়ে থাকা নতুন নীরব ঘাতকের নাম ‘ম্যাঙ্গানিজ’।

বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার ওয়াটার-এ প্রকাশিত ওই গবেষণায় জোয়েল পোডগোর্স্কি এবং মাইকেল বার্গ নামক দুই বিশিষ্ট গবেষক বিশ্বের ভূগর্ভস্থ পানির একটি বৈশ্বিক ঝুঁকিচিত্র আঁকার চেষ্টা করেছেন। তাদের দেওয়া তথ্য কেবল চমকপ্রদই নয়, অত্যন্ত আশঙ্কাজনকও বটে।

ভৌগোলিক বিস্তার ও হটস্পটে বাংলাদেশ

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৮ কোটি থেকে ২২ কোটি মানুষ অতিরিক্ত মাত্রায় ম্যাঙ্গানিজযুক্ত ভূগর্ভস্থ পানি পান করছেন। বিষাক্ত ম্যাঙ্গানিজের ঝুঁকিতে থাকা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের অধিবাসী। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তরুণ পলিমাটি (Young Alluvial Sediments) দ্বারা গঠিত নদী অববাহিকাগুলো এই দূষণের মূল কেন্দ্র। এর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ এলাকা সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে।

এছাড়া ভিয়েতনামের মেকং বদ্বীপ, হ্যানয়ের রেড রিভার বদ্বীপ, পাকিস্তানের কিছু সমতল অঞ্চল এবং আমেরিকার মিসিসিপি নদী অববাহিকা।অবকাঠামোগত বৈষম্যইউরোপের পোরো বদ্বীপ বা পোল্যান্ড থেকে জার্মানি পর্যন্ত অঞ্চলে ম্যাঙ্গানিজের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সেখানকার মানুষ আধুনিক পাইপলাইনের শোধিত পানি ব্যবহার করায় সুরক্ষিত। কিন্তু বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে গ্রামীণ ও শহরতলির বিশাল জনগোষ্ঠী সরাসরি গভীর বা অগভীর নলকূপের অনিরাপদ পানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই ঝুঁকি আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

যেভাবে পানিতে মিশছে বিষ

মাটির গভীরের কম অক্সিজেনযুক্ত (Anoxic) পরিবেশে এক বিশেষ ধরনের অণুজীবীয় বিক্রিয়া ঘটে। এই অণুজীবগুলো পলিতে জমা থাকা ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইডকে বিজারিত করে গলিয়ে ফেলে, যা খুব সহজেই ভূগর্ভস্থ পানিতে দ্রবীভূত হয়ে যায়। নদী অববাহিকার পলিমাটি কম বয়সী বা তরুণ হওয়ায় সেখানে জৈব পদার্থের সক্রিয়তা বেশি, যার ফলে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ঘটে।

মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও WHO-এর নতুন সতর্কবার্তাম্যাঙ্গানিজ মূল খাদ্যের অংশ হিসেবে মানবদেহের জন্য একটি প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান হলেও, পানের পানিতে এর উচ্চ উপস্থিতি সরাসরি স্নায়ুবিষ (Neurotoxin) হিসেবে কাজ করে।প্রভাবের ক্ষেত্রক্ষতির বিবরণস্নায়ুতন্ত্র (Nervous System)দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজযুক্ত পানি পানে প্রাপ্তবয়স্কদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশু ও নবজাতকএটি শিশুদের বুদ্ধিমত্তা (IQ) হ্রাস করে এবং স্বাভাবিক মানসিক ও আচরণগত বিকাশে মারাত্মক বাধার সৃষ্টি করে। এই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) খাওয়ার পানিতে ম্যাঙ্গানিজের সহনীয় ও নিরাপদ সীমা আগের প্রতি লিটারে ৪০০ মাইক্রোগ্রাম থেকে একধাক্কায় কমিয়ে মাত্র ৮০ মাইক্রোগ্রামে নির্ধারণ করেছে।

আর্সেনিক বনাম ম্যাঙ্গানিজ

আর্সেনিক ও ম্যাঙ্গানিজ একই ধরনের ভূরাসায়নিক পরিবেশ থেকে তৈরি হয় বলে মনে করা হতো যে, এরা একসঙ্গেই পানিতে থাকে। মানচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মাত্র ৪ শতাংশ স্থানে আর্সেনিক ও ম্যাঙ্গানিজ একসঙ্গে পাওয়া গেছে। কেউ যদি তার নলকূপের পানি পরীক্ষা করে ‘আর্সেনিকমুক্ত’ পান, তবে তিনি কোনোভাবেই নিশ্চিত হতে পারবেন না যে পানিটি পানের জন্য শতভাগ নিরাপদ। কারণ আর্সেনিক না থাকলেও সেই পানিতে উচ্চ মাত্রায় ম্যাঙ্গানিজ থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই পানির গুণগত মান বিচারে শুধু আর্সেনিক নয়, পৃথকভাবে ম্যাঙ্গানিজ পরীক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।

কৃষিতে ম্যাঙ্গানিজের ক্ষতিকর প্রভাব

উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য সামান্য পরিমাণ ম্যাঙ্গানিজ প্রয়োজনীয় হলেও, এটি সামান্য বেশি মাত্রায় থাকলেই উদ্ভিদের জন্য বিষাক্ত (Toxicity) হয়ে ওঠে। ভূগর্ভস্থ সেচের পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজ জমিতে প্রবেশ করায় ফসলের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে:

‘ম্যাঙ্গানিজ ইনডিউসড ক্লোরোসিস’ (Manganese-Induced Chlorosis): পানিতে অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজ থাকলে উদ্ভিদ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান (যেমন: লোহা বা আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম) সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। ফলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায় এবং সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

মূল ও কাণ্ডের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া: মাটিতে ম্যাঙ্গানিজের পরিমাণ বেড়ে গেলে গাছের মূল বা শেকড় পচে যায় অথবা বৃদ্ধি থেমে যায়। ফলে ধানসহ অন্যান্য শস্য গাছ থেকে পুষ্টি ও পানি টেনে নিতে পারে না।

ফসলের মান ও ফলন হ্রাস: ধান, গম, ও শাকসবজিতে ম্যাঙ্গানিজের বিষাক্ততা দেখা দিলে দানার আকৃতি ছোট হয়ে যায়, ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং ফসলের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়।

বাংলাদেশের ফসল কেন বেশি ঝুঁকিতে?

বাংলাদেশের প্রধান দানাদার ফসল হলো ধান, আর ধানের জমিতে প্রচুর পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচ দিতে হয়।

অতিরিক্ত সেচ: অগভীর ও গভীর নলকূপের মাধ্যমে তোলা পানি সরাসরি ধানক্ষেতে দেওয়া হয়। সেচের পানিতে থাকা উচ্চমাত্রার ম্যাঙ্গানিজ সরাসরি কৃষি জমিতে জমা হচ্ছে।

মাটির রাসায়নিক পরিবর্তন: অবাত বা পানি জমে থাকা অবস্থায় (Anaerobic Condition) মাটির ম্যাঙ্গানিজ সহজেই দ্রবীভূত হয়ে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য রূপে চলে আসে। ফলে আর্সেনিকের মতোই ম্যাঙ্গানিজ ধানগাছে জমা হয় এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে।

জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার দ্বিমুখী সংকট

আর্সেনিক সরাসরি স্নায়ুতন্ত্র, ত্বক ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গের ক্ষতি করে। অন্যদিকে ম্যাঙ্গানিজ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক রূপ নেয়। দেশের ফলন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের ধস নামতে পারে। ম্যাঙ্গানিজ আক্রান্ত জমিতে উৎপাদিত ধান ও সবজি খেলে তা সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদী স্নায়বিক সমস্যা (Manganism), মস্তিষ্কের ক্ষতি ও শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যাঙ্গানিজের এই নীরব থাবা থেকে দেশের কৃষি ও কৃষকদের রক্ষা করতে দ্রুত আর্সেনিকের পাশাপাশি দেশের কোন কোন অঞ্চলে নলকূপের পানিতে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা বেশি, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাপিং করতে হবে। বৃষ্টি বা উপরিভাগের (Surface water) পানি ধরে রেখে সেচ কাজে ব্যবহার বৃদ্ধি করায় জোর দিতে হবে। অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজ সহ্য করতে পারে এমন ফসলের জাত উদ্ভাবনে কৃষিগবেষকদের কাজ করতে হবে। রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহার কমিয়ে মাটিতে জৈব পদার্থ বাড়াতে হবে, যাতে মাটির বিষাক্ততা শোষণ ক্ষমতা বাড়ে।

কী বলছেন পরিবেশবিজ্ঞানী 

এই গবেষণার প্রধান লেখক এবং পরিবেশবিজ্ঞানী জোয়েল পোডগোর্স্কি জানিয়েছেন, এশিয়ার অঞ্চলগুলো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। এখানকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ সরাসরি অনিরাপদ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে। ইউরোপের পোরো বদ্বীপ কিংবা পোল্যান্ড থেকে জার্মানি পর্যন্ত ম্যাঙ্গানিজের ঝুঁকি থাকলেও সেখানকার মানুষ আধুনিক প্রযুক্তিতে পরিশোধিত পাইপের পানি পান করায় ঝুঁকিমুক্ত। কিন্তু এশিয়ায় সেই সুযোগ কম।

রাসায়নিক জটিলতার দিক থেকে ম্যাঙ্গানিজ ভয়াবহ হলেও, এটি পানি থেকে দূর করা অত্যন্ত সহজ এবং সাশ্রয়ী। ম্যাঙ্গানিজযুক্ত পানিকে বাতাসের বা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আনলে ম্যাঙ্গানিজ দ্রুত জারিত হয়ে অদ্রবণীয় ধাতব অক্সাইডে রূপ নেয় এবং পানির নিচে থিতিয়ে পড়ে। থিতিয়ে পড়া ও জমাট বাঁধা সেই উপাদানকে সাধারণ একটি বালি ফিল্টার দিয়ে ছেঁকে ফেললেই পানি সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও নিরাপদ হয়ে যায়।

আর্সেনিক বিপর্যয় থেকে আমরা শিখেছি কিভাবে অবহেলা একটি বড় স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে। ম্যাঙ্গানিজের ক্ষেত্রে যেন সেই ভুল পুনরায় না হয়, সেজন্য এখনই জাতীয় পর্যায়ে নলকূপের পানিতে ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি পরীক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ বালি ফিল্টার ব্যবহারের প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।

নিউজ নাউ বাংলা/ কেএ/ ২২ জুলাই ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button