
ব্যাংকের খাতায় খেলাপি ঋণের পাহাড়। মাত্র তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি। মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন খেলাপি। এমন এক কঠিন বাস্তবতায় বড় ঋণখেলাপিদের জন্য যেন খুলে দেওয়া হলো অপেক্ষাকৃত সহজ এক পথ—ঋণ পরিশোধে মিলছে দীর্ঘ ১৫ বছর, তারও আগে দুই বছর কোনো কিস্তি দিতে হবে না।
এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ঋণগ্রহীতাদের জন্য এই বিশেষ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এ সুবিধার জন্য আবেদন করতে হবে; ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যবসায়িক মন্দা, ঋণের সুদব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতেই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও ঋণখেলাপির দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে প্রশ্ন উঠছে—এই ছাড় কি সত্যিই সংকটে পড়া ব্যবসা বাঁচাবে, নাকি বড় ঋণখেলাপিদের জন্য তৈরি করবে নতুন সুবিধার দরজা?
বড় ঋণে বড় সময়
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণস্থিতি থাকা ঋণগ্রহীতার ঋণ দুই বছরের কিস্তি বিরতিসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করা যাবে।
আগে যারা বিশেষ সুবিধার আওতায় ঋণ পুনঃতফসিল করেছিলেন, তাদের আগের সুবিধার সময় নতুন মেয়াদের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। নতুন সুবিধা নিতে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই আবেদন করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে ডিসেম্বরের মধ্যে এসব আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুরোনো সুবিধার নতুন সুযোগ
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার জন্য বিশেষ সুযোগ দিয়েছিল। সে সময় খেলাপি ঋণের অন্তত ২ শতাংশ নগদ অর্থ জমা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ ছিল। এরপর দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তিন বা তার বেশি বার ঋণ পুনঃতফসিল করা থাকলে অতিরিক্ত ১ শতাংশ অর্থ জমা দেওয়ার বিধানও ছিল। সেই সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এবার নতুন করে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হলো।
বড় শিল্পের আবেদনের প্রভাব?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সিটি গ্রুপ, জিপিএইচ ইস্পাতসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন ও যোগাযোগ করেছে। তাদের আবেদন ও পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর বড় ঋণখেলাপিদের জন্য বাড়তি সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া নয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কারণে প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়াই লক্ষ্য।
খেলাপি ঋণে রেকর্ড চাপ
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চাপে রয়েছে। গত মার্চ শেষে ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
ঋণ বাড়ার চেয়ে খেলাপি বাড়ছে দ্রুত
তিন মাসে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ নতুন ঋণ বিতরণের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় চার গুণ। এই চিত্রই ব্যাংক খাতের সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করছে।

অনিয়মের দায়ও বড়
ব্যাংকারদের মতে, গত দেড় দশকে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদার, প্রিমিয়ার, বিসমিল্লাহ ও হল-মার্কসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম এবং কয়েকটি ব্যাংকের কেলেঙ্কারি ব্যাংক খাতের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করেছে।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হারও ৮০ শতাংশের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান মনে করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে এবং বর্তমান চাপ সামলাতে এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। তবে তার মতে, সুযোগটি গণহারে দেওয়া উচিত নয়। পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এবং পরীক্ষিত ভালো ব্যবসায়ীদেরই এ সুবিধার আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ব্যাংক খাতের গভীর সংকট থেকে উত্তরণে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ দরকার। পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
তবে অর্থ পাচারকারী ও অর্থ লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তার মতে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সুশাসন বজায় রেখেই এই নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে আরও ৬০ হাজার কোটি
এদিকে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ভর্তুকি সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই তহবিলের ঋণ বিতরণ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।
সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর—চার মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বড় ঋণখেলাপিদের জন্য ১৫ বছর সময় এবং দুই বছরের কিস্তি ছাড়—ব্যাংক খাতে নিঃসন্দেহে বড় সিদ্ধান্ত। প্রকৃত সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হতে পারে।
কিন্তু খেলাপি ঋণের পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে এই সুবিধার সাফল্য নির্ধারিত হবে একটি প্রশ্নের উত্তরে—কারা পাবেন ছাড়, আর কারা জবাবদিহির আওতায় থাকবেন?
ব্যাংক খাতকে বাঁচাতে ছাড় প্রয়োজন হতে পারে; তবে সেই ছাড় যেন অনিয়মের পুরস্কার না হয়ে যায়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬



