Leadএনএনবি বিশেষ

৪৮ বছরের চড়াই-উতরাই ও বিএনপির আগামী

জাগদল থেকে ক্ষমতার মসনদ

১৯৭৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর। ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ঘোষণা দেন নতুন রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)-এর।

এর ঠিক আগের দিন, ১ সেপ্টেম্বর বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় জিয়ার নেপথ্য পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ বা জাগদলকে। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে জন্ম নেওয়া এই দলটিকে গত ৪৮ বছরে বহু চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে।

যেভাবে জাগদলের সূচনা ও বিএনপির জন্ম
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫-এর নভেম্বরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি একজন সৈনিক।’ অথচ সেই সৈনিকই ধাপে ধাপে রাজনীতিতে থিতু হন।

১৯৭৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে চেয়ারম্যান করে গঠিত হয় ‘জাগদল’।ওই বছরের ১ মে মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ভাসানী ন্যাপ, শাহ আজিজুর রহমানের মুসলিম লীগসহ কয়েকটি দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’, যার চেয়ারম্যান হন জিয়াউর রহমান নিজেই।

এই ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ঠিক তিন মাস পর জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।

ডানপন্থী থেকে বামপন্থী—সব রাজনৈতিক আদর্শের নেতাদের এক ছাতার নিচে এনে জিয়া বলেছিলেন, “দেশের উন্নতির জন্যই এই ঐতিহাসিক প্রয়োজন।” আমৃত্যু সেই লড়াইটা চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

98c7425c-7221-4597-9cb6-fe2f2b56ac08.webp

নেতৃত্বের পালাবদল এবং ক্ষমতার লড়াই
বিএনপির রাজনৈতিক পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দলটি একাধিকবার দেশ শাসনরে ভার পেয়েছে। কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও অত্যন্ত সফল ও দৃঢ়ভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে দলটি।

জিয়ার হত্যাকাণ্ড ও এরশাদের অভ্যুত্থান: ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দলের হাল ধরেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। কিন্তু ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হয়।

খালেদা জিয়ার উত্থান:
দলের এই চরম সংকটে রাজনীতিতে আসেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া। তার আপসহীন নেতৃত্বে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরে। পরবর্তীতে ২০০১ সালেও দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে।

১৫ বছরের রাজনৈতিক বনবাস ও ২০২৬-এ প্রত্যাবর্তন
২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন এবং পরবর্তী ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছর ছিল বিএনপির জন্য সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়।

হামলা, মামলা, গুম এবং শীর্ষ নেতৃত্বের কারাবাসের কারণে দলটি প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। দলের বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়।

d378dabb-1621-448d-aa55-ee1a33d675b3.webp

তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেড় বছর পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ভূমিধস জয় পায়।

সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি আসন নিশ্চিত করে দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারও ক্ষমতায় ফেরে দলটি। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান।

কী আছে বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়?
ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপি সমমনা দলগুলোকে নিয়ে রাষ্ট্র মেরামতের যে ‘৩১ দফা রূপরেখা’ ঘোষণা করেছিল, সেটাই এখন তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মূল ভিত্তি। এর উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:

ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা এবং পরপর দুই মেয়াদের বেশি কারও প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার বিধান করা।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: বর্তমান এককক্ষবিশিষ্ট সংসদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের নিয়ে একটি উচ্চকক্ষ (Upper House) গঠন করা।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার:
মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠন করা।

দুর্নীতি দমন ও শ্বেতপত্র: গত দেড় দশকের অর্থপাচার ও দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করে জড়িতদের বিচার করা এবং দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা।

সংবিধান সংস্কার: একটি সংবিধান সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক সংশোধনীগুলো বাতিল করে গণভোট ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।

ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে জন্ম নেওয়া বিএনপি আজ রাজপথের দীর্ঘ লড়াই শেষে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায়। তবে তাদের আসল পরীক্ষা শুরু হয়েছে এখন—দীর্ঘদিনের জঞ্জাল সরিয়ে নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফার কতটুকু তারা বাস্তবে রূপ দিতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button