মায়ামিতে স্নায়ুক্ষয়ী সেমিফাইনালের অপেক্ষায় আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড
◉ ফকল্যান্ডের ভূত, স্কাইক্যাম বিতর্ক

◉➤ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের লাইনআপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার খবরটি নিশ্চিতভাবেই সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য একটি রসালো উপাদান। ইতিহাস, রাজনীতি আর ফুটবলীয় রোমান্টিসিজমের এক নিখুঁত ককটেল হিসেবে এই ম্যাচকে দাঁড় করানো হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তবে আবেগ আর কল্পকথার বাইরে গিয়ে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়ালে দেখা যায়, মায়ামির এই বহুল কাঙ্ক্ষিত সেমিফাইনালে পা রাখার আগে কোয়ার্টার-ফাইনালে দুই দলকেই ১২০ মিনিটের চরম ধুঁকতে থাকা ফুটবল খেলতে হয়েছে। এখানে কোনো রূপকথা নেই; আছে শুধু ঘাম, বিতর্ক আর প্রবল স্নায়ুচাপে টিকে থাকার লড়াই।
আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার ৩-১ গোলের স্কোরলাইনটি দেখে যদি মনে হয়, বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা মাঠে দাপট দেখিয়েছে, তবে সেই ভাবনা আদ্যোপান্ত ভুল। ম্যাচের ১০ম মিনিটে এগিয়ে গিয়েও ৬৭তম মিনিটে ড্যান এনদোয়ের গোলে সমতা হজম করে বসে লিওনেল স্কালোনির দল। মূলত ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় ৭২তম মিনিটে, যখন সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলো ডাইভ দিয়ে লাল কার্ড দেখেন।
এই ঘটনাটি আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে নিশ্চিত কার্ড থেকে বাঁচানোর পাশাপাশি দশজনের সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত সুবিধা এনে দেয়। তবুও ১-১ সমতা ভাঙতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অপেক্ষা করতে হয় অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত। শেষমেশ ১১৪তম মিনিটে জুলিয়ান আলভারেজ এবং ১২০+১ মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের গোলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে তারা।
অন্যদিকে, নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডের জয়ের গল্পটিও খুব একটা মসৃণ নয়। জুড বেলিংহ্যাম জোড়া গোল করে ইংলিশদের ত্রাতা বনেছেন ঠিকই, তবে নরওয়ের বিপক্ষে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে তার প্রথম গোলটি বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

নরওয়ের দাবি অনুযায়ী, গোলরক্ষক ওরইয়ান নিলান্ডের নেওয়া গোলকিক স্টেডিয়ামের ‘স্কাইক্যাম’ (Skycam)-এর তারে লেগে দিক পরিবর্তন করেছিল, যা থেকে ইংল্যান্ড আক্রমণের সুযোগ পায়। রেফারি গোলটি বৈধ ঘোষণা করলেও, প্রযুক্তিগত অব্যবস্থাপনার এই অভিযোগটি অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
ফিফার স্বভাবসুলভ নীরবতার কারণে এই দাবিটি আদৌ সত্য কি না, তা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ এখনই মিলছে না। তবে দিনশেষে, অতিরিক্ত সময়ে বেলিংহ্যামের দ্বিতীয় গোলটিই মূলত ইংল্যান্ডকে সেমির টিকিট এনে দেয়।
স্বভাবতই আগামী কয়েকদিন এই ম্যাচকে ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধের ফুটবলীয় সংস্করণ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার যে সস্তা ও একঘেয়ে প্রবণতা সংবাদমাধ্যমে দেখা যাবে, একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন নিখাদ পরিসংখ্যানে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন পর্যন্ত ৫ বারের দেখায় ৩টি জয় নিয়ে ইংল্যান্ড এগিয়ে আছে। ১৯৬২ সালের গ্রুপ পর্বে ৩-১ এবং ১৯৬৬ সালের কোয়ার্টার-ফাইনালে ১-০ গোলের জয় ইংলিশদের পক্ষেই কথা বলে (যে ম্যাচটি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে, তৎকালীন ইংলিশ কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইনদের ‘জানোয়ার’ বলেছিলেন)। এমনকি ২০০২ সালের গ্রুপ পর্বেও ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টিতে ১-০ গোলে জিতেছিল তারা।

কিন্তু নকআউট পর্বের স্নায়ুচাপে আর্জেন্টিনাকে সামলানোর ইতিহাস তাদের জন্য কখনোই সুখকর নয়। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার-ফাইনালে ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ও বিতর্কিত জোড়া গোল কিংবা ১৯৯৮ সালের শেষ ষোলোতে টাইব্রেকারে হেরে যাওয়া—এই ক্ষতগুলো ইংলিশদের স্মৃতিতে এখনো দগদগে।
সব মিলিয়ে এই সেমিফাইনালের চিত্রনাট্য অত্যন্ত পরিষ্কার। দুই দলই শেষ চারে উঠেছে রেফারির কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সুবিধা নিয়ে এবং ট্যাকটিকাল দুর্বলতা ঢাকতে একক খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যের ওপর ভর করে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং চলতি টুর্নামেন্টের একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন। আর্জেন্টিনার ডিফেন্স লাইন যেমন সুইসদের গতির কাছে বারবার উন্মুক্ত হয়েছে, ইংল্যান্ডও তেমনি মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে ধুঁকেছে।
সেমিফাইনালে তাই আবেগ বা পুরোনো ইতিহাস কোনো কাজে আসবে না। কোয়ার্টার-ফাইনালের এই ট্যাকটিকাল ভুলগুলো থেকে যারা শিক্ষা নেবে এবং স্নায়ুর চাপ সামলাতে পারবে, তারাই ফাইনালের টিকিট কাটবে। বাকি সব কেবলই মিডিয়ার তৈরি করা সস্তা হাইপ।
নিউজ নাউ বাংলা/ কেএসসি/ জেডআরসি/ ১২ জুলাই ২০২৬



