বাংলাদেশ

বিশ্ববাজারে সুযোগের ছড়াছড়ি, দেশে ধুঁকছে ‘সোনালি আঁশ’

পরিবেশবান্ধব পণ্যের বিশ্ববাজারে যখন রীতিমতো জোয়ার, বাংলাদেশ তখন পাটের শোকগীতি গাইতে ব্যস্ত। একদিকে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে জুট ব্যাগ বা জিও-টেক্সটাইলের চাহিদা আকাশ ছুঁয়েছে, অন্যদিকে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চাষি পাটচাষ ছাড়ছেন।

স্বাধীনতার আগে যে ফসল ছিল অর্থনীতির মেরুদণ্ড, আজ তা কেবলই নষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এক সোনালি অতীত। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সুযোগ হারাচ্ছি, নাকি অব্যবস্থাপনা দিয়ে নিজ হাতেই তার গলা টিপে মারছি?

পরিসংখ্যান ও পতনের নির্মম খতিয়ান
সরকারি নথিপত্র যতই আশার বাণী শোনাক, মাঠের চিত্র বেশ পরিষ্কার এবং রূঢ়। বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) তথ্যমতে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে এই খাত। দেশের প্রায় সাড়ে তিনশো বেসরকারি পাটকলের মধ্যে পুরোপুরি সচল আছে মাত্র ২৫-৩০টি। বাকিগুলো ধুঁকছে অথবা মৃত।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে ১১ লাখ টন পণ্য উৎপাদিত হতো, ২০২৪-২৫ সালে তা নেমেছে মাত্র ৫ লাখ ৬৭৬ টনে। সাত বছরে পতন প্রায় ৫৫ শতাংশ। ভর্তুকি পাওয়া সরকারি মিলগুলোর সঙ্গে লড়তে গিয়ে চড়া ব্যাংক সুদ আর ঋণের ভারে পিষ্ট হচ্ছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা।

সার, বীজ ও শ্রমিকের বাড়তি খরচে কৃষকের নাভিশ্বাস উঠলেও, লাভের গুড় ঠিকই ফড়িয়াদের পকেটে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে রপ্তানি বাড়াতে পারলে খুব বেশি দিন সময় লাগবে না সোনালী আঁশের যৌবন ফেরাতে।

jute-golden-fiber.jpg

নীতিগত স্থবিরতা ও কাগুজে আইন
২০১০ সালের ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন’ বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা বাজারের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এর ওপর মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে রপ্তানি প্রণোদনা কমানোর সিদ্ধান্ত।

পাটের সুতার প্রণোদনা ৭% থেকে ৩%-এ এবং বৈচিত্র্যময় পণ্যের জন্য ২০% থেকে ১০%-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। ভারত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসিয়ে রেখেছে, আর আমরা পুরোনো যন্ত্রপাতি ও মান্ধাতার আমলের প্রযুক্তি আঁকড়ে ধরে বসে আছি।

মূল্যের ব্যবধান ও হারানো ৫ বিলিয়ন ডলার
সবচেয়ে বড় বোকামিটা হচ্ছে আমাদের কাঁচামাল বিক্রির প্রবণতায়। যে পাটের সুতা বিদেশে মাত্র ১৫০-১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়, তা দিয়ে একটি ইকো-ফ্রেন্ডলি ব্যাগ বানালে দাম মেলে হাজার টাকার ওপরে।

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু কাঁচামাল নয়, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানিতে মনোযোগ দিলে বর্তমান অবকাঠামো দিয়েই বছরে প্রায় ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) ডলার আয় করা সম্ভব।

সরকার বন্ধ মিলগুলো ইজারা দিচ্ছে, জেডিপিসি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে—এসব নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু ব্যাংকের চড়া সুদ, নীতিগত অস্থিরতা আর আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে এই ছোটখাটো পদক্ষেপগুলো ফুটো বালতিতে জল ঢালার মতোই। বিশ্ববাজার আমাদের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকবে না।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২২ আগস্ট ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button