জেতার চান্স-ই নেই অনলাইন জুয়ায়, ফাঁদে নিঃস্ব তরুণ প্রজন্ম
বোনাসের লোভে শুরু, শেষে সর্বনাশ

◉➤ কারওয়ান বাজার থেকে ভোরে পণ্য এনে রামপুরা কাঁচাবাজারে বিক্রি করতেন তরুণ ব্যবসায়ী সাইফুল। কয়েক মাস আগে বাজারের এক পরিচিত ব্যক্তি তাকে মোবাইলের একটি অ্যাপ দেখিয়ে বলেন, ‘ক্রিকেট ম্যাচে ১০০ টাকা লাগাও, জিতলে ২৫০ পাবা।’ প্রথমে ১০০ টাকা বাজি ধরে ২২০ টাকা পান তিনি।
এতে তার মনে হয়, সারা দিন রোদে পুড়ে যা আয় হয়, এখানে তা মিনিটেই সম্ভব। পরে কৌতূহল আর লোভ থেকেই অনলাইন জুয়ার নেশা তৈরি হয়। কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যবসাসহ সব হারিয়েছেন সাইফুল।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান বনশ্রীর বাসিন্দা জালাল আনোয়ার। তিনি বলেন, শুরুতে বাজি ধরে জিতলেও পরে ক্যাসিনোতে গিয়ে সব হারিয়েছেন। আগে মুদি দোকান চালাতেন, এখন অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্ত্রী-সন্তানকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। লজ্জায় নিজেও গ্রামে যেতে পারেন না। তার মতো রাজধানী নয়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও লাখো সচ্ছল মানুষ এই জুয়ার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগেরে বিষয় হচ্ছে, ন্যূনতম প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ অনলাইন জুয়ায় বুঁদ হয়ে আছে। তাদের এই ক্রেজি মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। সহজ ফাঁদে পকেট কাটছে চক্রটি। আর শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম সেই ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে।
রাজধানী থেকে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন হয়ে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে প্রতিনিয়ত গ্রেফতার হচ্ছে এজেন্টরা। জব্দ হচ্ছে হাজার হাজার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) নম্বর। তবু চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তবে সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এজেন্ট গ্রেফতার করে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাদের ভাষ্য, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ-ই পুরো নেটওয়ার্কের মূলশক্তি। এগুলো বন্ধ না করলে এক এজেন্টের জায়গায় আরেক এজেন্ট তৈরি হবে, আর জুয়ার ফাঁদে পড়ে মানুষ নিঃস্ব হতে থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি এখন মহামারির পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার পাশাপাশি হত্যাসহ নানা ধরনের অপরাধও ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার সম্প্রতি কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। পুলিশও শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নজরদারি বাড়িয়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিটি অনলাইন জুয়ার সাইটে প্রবেশ করলে নিবন্ধনের জন্য নাম, মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিতে হয়। এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেন এজেন্টরা। একজন এজেন্ট আবার শত শত নতুন এজেন্ট তৈরি করতে পারেন। এই এজেন্টরাই নতুন খেলোয়াড়দের নিবন্ধন করে দেন এবং শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত অনলাইন জুয়ার বিস্তারে ভূমিকা রাখছেন।
প্রতিটি জুয়ার সাইটে শত শত নয়, লাখ লাখ এজেন্ট রয়েছে। মূলত তারাই যুবকদের অনলাইন জুয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। এসব সাইট নতুন খেলোয়াড়দের জন্য বোনাসের ফাঁদ পাতে। নিবন্ধনের পর জমাকৃত অর্থের ওপর কখনও ৫০ শতাংশ, আবার কখনও ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বোনাস দেওয়া হয়।
দেখা যায়, কেউ এক হাজার টাকা জমা দিলে সাইট থেকে আরও এক হাজার টাকা যোগ করে তার ব্যালান্স দুই হাজার টাকা দেখানো হয়। এটি নিয়ে খেলা শুরু করলে প্রথম অবস্থায় অনেকে কিছুটা জিততেও পারেন। এরপরই শুরু হয় লোভ। সেই লোভে পড়ে একের পর এক টাকা জমা দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সব হারিয়ে ফেলেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, টাকা জমা দেওয়ার পর বড় অঙ্কের অর্থ জিতলেও তা সঙ্গে সঙ্গে উত্তোলন করা যায় না। নির্দিষ্ট পরিমাণ খেলা শেষ করার পরই টাকা তোলার সুযোগ থাকে। কিন্তু সেই সময় আসার আগেই অধিকাংশ খেলোয়াড়ের ব্যালান্স শেষ হয়ে যায়। ফলে জয়ের চেয়ে হারের সংখ্যাই বেশি। আবার একদিন জেতার পর সেই জয়ের নেশায় পুনরায় খেলতে গিয়ে আরও বেশি অর্থ হারান তারা।
সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার অ্যাপগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে শুরুতে খেলোয়াড়কে জিতিয়ে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। একে বলা হয় ‘লোয়ার দ্য গার্ড’ কৌশল। একবার আসক্তি তৈরি হলে অ্যালগরিদম এমনভাবে পরিচালিত হয় যে দীর্ঘমেয়াদে জেতা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি বিশেষজ্ঞ রাসেল সরকার বলেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে মেগা ক্যাসিনো ওয়ার্ল্ড। এই ওয়েবসাইটে শত শত জুয়ার গেম রয়েছে। এসব গেমের আলাদা অ্যাপও আছে। অর্থাৎ একটি প্ল্যাটফর্মেরই বহু শাখা-উপশাখা রয়েছে। এ ছাড়া ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট ও ওয়ানএক্সপার্টনার্সও দেশের অন্যতম বড় অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম।
তিনি বলেন, ‘প্রথমত এসব ওয়েবসাইট ও অ্যাপের লিংক বন্ধ করতে হবে। তা সম্ভব না হলে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ যেসব মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে এসব সাইটে টাকা জমা হয়, সেই এজেন্ট নম্বরগুলো বন্ধ করতে হবে। তবে সবচেয়ে কার্যকর হবে ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করে দেওয়া। এজেন্টদের খুঁজে বের করার চেয়ে সাইট বন্ধ করলে দেশে অনলাইন জুয়া দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, ‘অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। আমরা এজেন্টদের গ্রেফতারের পাশাপাশি অনলাইন সাইটও বন্ধের ওপর জোর দিচ্ছি। এ বিষয়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তালেব বলেন, ‘সিআইডির দল দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ সজাগ। কারা, কীভাবে এটি পরিচালনা করছে, তা খুঁজে বের করছি।’
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২৪ জুলাই ২০২৬



