সর্বশেষসারাদেশ

জীবিকার তাগিদে পথে হাত পাতা অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াবে কে

বয়সের ভারে ন্যুব্জ, শারীরিকভাবে অক্ষম কিংবা অভাবের তাড়নায় কর্মক্ষমতা হারানো মানুষগুলো জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন পথে পথে ঘুরে মানুষের কাছে হাত পাতছেন। পথচারীদের কেউ তাদের এক টাকা, কেউ দুই টাকা, আবার কেউবা খাবার দিয়ে সাহায্য করছেন।

এভাবেই দিন কাটে তাদের। পথে ঘুরে যারা আজ হাত পাতছেন, তাদের হাতে যদি কাজ তুলে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো এক দিন সেই হাত আর সাহায্যের জন্য বাড়বে না বাড়বে নিজের জীবিকা গড়ার জন্য। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় ভিক্ষুকদের সর্বশেষ জরিপ হয়েছিল ২০২০ সালে। ওই জরিপে ১ হাজার ২০০ ভিক্ষুকের তথ্য পাওয়া যায়। এরপর কেটে গেছে প্রায় ছয় বছর। কিন্তু এর মধ্যে আর কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ হয়নি।

ফলে বর্তমানে উপজেলায় প্রকৃত ভিক্ষুকের সংখ্যা কত, তাদের মধ্যে কতজন এখনো ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত, কতজন অন্য পেশায় ফিরেছেন কিংবা কতজন নতুন করে এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন—তার কোনো হালনাগাদ সরকারি হিসাব নেই। এর মধ্যেই ২০২০ সালের জরিপে শনাক্ত ১ হাজার ২০০ ভিক্ষুকের মধ্যে সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসনের আওতায় এসেছেন মাত্র প্রায় ৫০ জন।

অর্থাৎ ছয় বছরে ওই তালিকার বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পুনর্বাসনের সুযোগ পৌঁছায়নি। ভিক্ষুকদের এই বাস্তবতার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে খুচরা টাকার সংকট। আগে পথচারী, দোকানদার ও ক্রেতাদের কাছ থেকে ১, ২ কিংবা ৫ টাকা করে পাওয়া গেলেও এখন অনেকের কাছেই খুচরা টাকা থাকে না। ফলে সারাদিন পথে ঘুরেও আগের মতো আয় করতে পারছেন না তারা। এতে একবেলার খাবারের ব্যবস্থা হলেও চিকিৎসা, ওষুধ, পোশাক কিংবা পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর মতো অর্থ তাদের হাতে থাকছে না।

রাণীশংকৈল পৌর শহরে ভিক্ষা করা এক বয়স্ক ব্যক্তি বলেন, বয়স হয়েছে, কাজ করার শক্তি নেই। আগে সারাদিন ঘুরে কোনো রকমে সংসার চালানোর মতো টাকা পাওয়া যেত। এখন অনেকেই বলেন খুচরা টাকা নেই। ফলে আয় অনেক কমে গেছে। পৌর শহরের ব্যবসায়ী শামসুদ্দিন সাগর বলেন, ১, ২ কিংবা ৫ টাকার নোট বা কয়েন হাতে না থাকায় সবাইকে সহযোগিতা করা সম্ভব হয় না। ১০ টাকা করে দিলে সারাদিনে অনেক টাকা চলে যায়।

তবে দিন দিন ভিক্ষুকের সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষ করে বুধবারের হাটের দিনে তাদের সংখ্যা বেশি দেখা যায়। আরেক ব্যবসায়ী ফেরদৌস বলেন, ইচ্ছা থাকলেও খুচরা টাকার অভাবে অনেককে সহযোগিতা করা সম্ভব হয় না। তবে বয়স্ক ও অসহায় মানুষদের ভিক্ষার ওপর নির্ভরশীল না রেখে সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসন করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের জরিপের পর রাণীশংকৈলে ভিক্ষুকদের নিয়ে আর কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ হয়নি।

ফলে ছয় বছর ধরে একই তথ্যের ওপর নির্ভর করেই চলছে সরকারি হিসাব ও পুনর্বাসন কার্যক্রম। এতে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারি তালিকার ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সময়ে কতজন ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়েছেন, কতজন মারা গেছেন, কতজন অন্য পেশায় গেছেন কিংবা নতুন করে কতজন ভিক্ষাবৃত্তিতে যুক্ত হয়েছেন—এসব তথ্য অজানাই থেকে গেছে। রাণীশংকৈল উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জরিপে শনাক্ত ভিক্ষুকদের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ জনকে সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

পুনর্বাসনের আওতায় কাউকে দোকান, কাউকে গবাদিপশু, আবার কাউকে ভ্যান গাড়ি দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য ছিল ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে আয়বর্ধক কাজে যুক্ত করা। রাণীশংকৈল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, এ উপজেলায় জরিপকৃত ভিক্ষুকের সংখ্যা ১ হাজার ২০০-এর অধিক। তবে এই সংখ্যা ২০২০ সালের জরিপভিত্তিক। এরপর নতুন করে পূর্ণাঙ্গ জরিপ হয়নি। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ জনকে সরকারিভাবে দোকান, গবাদিপশু ও গাড়ি কিনে দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

এ কার্যক্রম চলমান। তবে কার্যক্রমটি আরও গতিশীল করতে বরাদ্দের সংখ্যা বাড়ানো উচিত।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button