Leadবাংলাদেশ

কলেরা ঠেকাতে ওরাল টিকাদান শুরু

টিকাদানে ব্যর্থতায় হামের বিপজ্জনক উল্লম্ফন

সারাদেশে শনিবার (২২ আগস্ট) থেকে ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে দুই ডোজের ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। সরকার যখন এই বিশেষ কর্মসূচি নিয়ে তৎপর, তখন দেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) চরম কাঠামোগত দুর্বলতা উন্মোচিত হয়েছে হাম-রুবেলার সাম্প্রতিক নজিরবিহীন প্রাদুর্ভাবে।

একদিকে কলেরা হটস্পটগুলোতে জরুরি সুরক্ষাবলয় তৈরির চেষ্টা, অন্যদিকে রুটিন টিকার ড্রপআউট রোধ করতে না পারায় ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মহামারি আকারে হাম ছড়িয়ে পড়ার দ্বিমুখী বাস্তবতায় পড়েছে দেশের জনস্বাস্থ্য খাত।

কলেরা টিকাদান: ১৪ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৫১ লাখের বেশি মানুষ আওতাভুক্ত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) ও আইসিডিডিআর,বি-এর ২০২২-২৩ সালের যৌথ গবেষণায় দেশে ১৪৪টি ‘কলেরা হটস্পট’ চিহ্নিত হওয়ার পর পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি মাঠে নেমেছে।

শনিবার (২২ আগস্ট) থেকে প্রথম ডোজ চলবে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত। গর্ভবতী নারী ব্যতীত এক বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মোট ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ বিনামূল্যে এই ওরাল টিকা পাবেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচরের ১৭টি ওয়ার্ড (১৯২টি কেন্দ্র) এবং ঢাকা উত্তর সিটির তেজগাঁও, খিলক্ষেত ও শেরেবাংলা নগর। এছাড়া মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো এর আওতাভুক্ত।

হামের ভয়াবহ প্রত্যাবর্তন: ৫ বছরের গড় টপকে আক্রান্তের সংখ্যা ৮ হাজার ছাড়াল
কলেরা নিয়ে প্রশাসনিক তোড়জোড় থাকলেও নিয়মিত টিকাদানের ব্যর্থতায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে হাম-রুবেলার ক্ষেত্রে। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, রুটিন টিকায় নজরদারির ঘাটতির কারণেই ভাইরাসটির এমন বিস্তার ঘটেছে।

২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সারাদেশে ৫৭ হাজার ৮৫৬টি সন্দেহভাজন এবং ৮ হাজার ৬৭টি নিশ্চিত হামের কেস শনাক্ত হয়েছে। অথচ বিগত পাঁচ বছরে দেশে বার্ষিক গড় কেস ছিল ২৮০-এর নিচে। শনাক্ত রোগীদের ৮১ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতে সংক্রমণের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।

২০২৩ সালের ইপিআই কভারেজ ডেটা অনুযায়ী, প্রথম ডোজ (MR1) কভারেজ ৮৬.১ শতাংশ হলেও দ্বিতীয় ডোজে (MR2) তা নেমে এসেছে ৮০.৭ শতাংশে। প্রায় ২০ শতাংশ শিশুর দ্বিতীয় ডোজ বাদ পড়া ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সম্প্রতি ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হলেও ডিজিএইচএস-এর তথ্যে দেখা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া (৩৭.১৩%), নোয়াখালী (৩৯.৯৯%) ও মানিকগঞ্জে (৩৮.২৭%) কভারেজ এখনো ৪০ শতাংশের নিচে।

অতীত সাফল্য বনাম নজরদারির অভাব
২০০৬ সালে পোলিওমুক্ত হওয়া এবং ২০০৮ সালে মাতৃ ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার নির্মূল করার মাধ্যমে বাংলাদেশ অতীতে টিকাদানে বৈশ্বিক সুনাম কুড়িয়েছিল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে শহুরে বস্তি, দুর্গম চরাঞ্চল ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইপিআই নজরদারি ভেঙে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কলেরা ঠেকাতে সাময়িক ক্যাম্পেইন ইতিবাচক হলেও রুটিন টিকাদানের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে এবং মাঠপর্যায়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে একটি রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অন্য টিকা-প্রতিরোধ্য রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ২২ আগস্ট ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button