পশ্চিমা ঐক্যে ফাটল আর নতুন ভূরাজনীতির ইঙ্গিত
- মার্কিন নির্বাচন ও বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তর: উদারনৈতিক বিশ্বায়নের পতন এবং জাতীয় পরিচয়ের পুনরুত্থান
- অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বৈশ্বিক অভিঘাত: মার্কিন নির্বাচনে লুকিয়ে থাকা বিশ্বব্যবস্থার ভাঙা-গড়ার খেলা
➤ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনগুলো সাধারণত দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদল বা প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হিসেবেই বিবেচিত হয়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে মার্কিন মধ্যবর্তী বা সাধারণ নির্বাচনকে কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক বিশাল রূপান্তর। বিশ্বজুড়ে উদারনৈতিক বিশ্বায়নের দীর্ঘদিনের প্রভাব এখন প্রশ্নের মুখে; পশ্চিমা বিশ্বের ঐক্যে ফাটল ধরেছে এবং সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস ও সভ্যতাগত স্বাতন্ত্র্য আবারো রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছে।
রাশিয়ার আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সাময়িকী রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর প্রধান সম্পাদক এবং প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিওদর লুকিয়ানভ তার সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে মার্কিন রাজনীতি এবং বৈশ্বিক পরিবর্তনের এই গভীর সম্পর্কটি অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।
উদারনৈতিক বিশ্বায়নের অবসান ও পশ্চিমা ঐক্যে ফাটল
আশির দশক থেকে শুরু করে ২০১০-এর দশক পর্যন্ত, বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর, পশ্চিমা বিশ্বে একটি জোরালো ধারণা তৈরি হয়েছিল যে—উদারনৈতিক গণতন্ত্র এবং বাজার অর্থনীতিই মানবসভ্যতার চূড়ান্ত মডেল।
পশ্চিমা বিশ্ব আশা করেছিল, অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরশীলতার ফলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত কমবে এবং পুরো বিশ্ব একই মূল্যবোধের ছাতার নিচে চলে আসবে।
লুকিয়ানভের মতে, ইউরোপের রাজনীতিকরা এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছেন, আবার ট্রাম্পপন্থিরাও ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। অর্থাৎ, পশ্চিমা দেশগুলোর মতপার্থক্য এখন আর শুধু পররাষ্ট্রনীতি বা সামরিক চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন তাদের নিজস্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ধারণের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
নিজস্ব পরিচয়ের সংকটে পশ্চিমা সভ্যতা
লুকিয়ানভের বিশ্লেষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘পশ্চিমা সভ্যতা’র পরিচয়-সংকট। কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা দেশগুলো মানবাধিকার, গণতন্ত্র বা ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো ‘সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ’কে তাদের ভূরাজনৈতিক সম্প্রসারণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
অন্য সমাজের ওপর নিজেদের এই মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তারা ধীরে ধীরে তাদের নিজেদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক শেকড় থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার বৈপরীত্য
বিশ্বায়নের ফলে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি এমনভাবে যুক্ত হয়েছে যে, কোনো বৃহৎ শক্তির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক রূপান্তর আর তার নিজস্ব সীমানায় আটকে থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মেরুকরণ বা সামাজিক বিভাজনের অভিঘাত এখন ইউরোপসহ সারা বিশ্বেই অনুভূত হচ্ছে।
লুকিয়ানভের মতে, বর্তমান বিশ্ব এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের কারণে কোনো দেশই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারছে না, অন্যদিকে প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের জাতীয় স্বার্থ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষায় আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠছে। একটি দেশের জন্য কার্যকর রাজনৈতিক মডেল অন্য দেশেও সমানভাবে কাজ করবে—এমন ভ্রান্ত ধারণা আজ ভেঙে পড়েছে।
সারসংক্ষেপে, বিশ্বব্যবস্থার এই পরিবর্তন শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির পুনর্বণ্টন নয়, এটি মূলত প্রতিটি সমাজের নিজস্ব রূপান্তর ও আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার লড়াই। আর এ কারণেই, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও রাজনীতির এই মৌলিক পরিবর্তন শুধু আমেরিকার ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করছে না, বরং একটি নতুন, স্বাতন্ত্র্যমুখী বিশ্বব্যবস্থার পরিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০৫ নভেম্বর ২০২৬