চাকরির পদবি ‘অফিস সহায়ক’ (পিয়ন), সরকারি স্কেল অনুযায়ী বেতন পান চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর। তবে বাস্তবে তাঁর পরিচিতি অঢেল সম্পদের মালিক হিসেবে। রাজধানীর একাধিক অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, কোটি টাকার প্লট, আবাসন ব্যবসায় শেয়ার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে বিপুল অর্থ।
তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের আলোচিত কর্মচারী হারুন অর রশিদ। প্রভাবশালীদের ছায়াতলে থেকে লাগামহীন অনিয়ম ও ঘুষ-বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি অন্তত শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
নিয়োগ বাণিজ্য দিয়ে উত্থান
অনুসন্ধানে জানা যায়, হারুনের এই বিপুল সম্পদ অর্জনের সূচনা ২০০৪ সালে। তৎকালীন সময়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে বহুল আলোচিত ‘চেইনম্যান’ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলে ঘুষ ও জালিয়াতি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সে সময় পদমর্যাদায় ছোট হলেও মন্ত্রণালয়ের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে পরিচিতি পান।
এই নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজের ছোট ভাই জামাল ও বোন নাজমাকেও সরকারি চাকরি পাইয়ে দেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অক্ষত থাকে তাঁর শক্তিশালী চক্র। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে তাঁর প্রভাব ও অনিয়মের পরিধি।
রাজধানী ও গ্রামে অঢেল সম্পদ
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং নিজ জেলায় হারুন ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ‘ভূমি পল্লী’ প্রকল্পে তাঁর নামে রয়েছে পাঁচ কাঠা করে দুটি মূল্যবান প্লট ও দোকান।
এ ছাড়া সম্প্রতি গড়ে ওঠা ‘তুরাগ ভূমি পল্লী-২’ আবাসন প্রকল্পে রয়েছে তাঁর একাধিক শেয়ার। অর্জিত কালো টাকা সাদা করতে নিজের আপন ভায়রা লিটন হাওলাদারের সঙ্গে যৌথভাবে একটি আবাসন ব্যবসাও পরিচালনা করছেন তিনি।
রাজধানীতে ফ্ল্যাট, গ্রামে বিঘা বিঘা জমি: রাজধানীর মিরপুরে মণিপুর হাইস্কুলের বিপরীতে একটি বহুতল ভবনে রয়েছে তাঁর একাধিক ফ্ল্যাট। এ ছাড়া মিরপুর-১৩ নম্বরে নিজস্ব আরও একটি আধুনিক ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। নিজ জেলা শরীয়তপুরের নাগেরপাড়া ইউনিয়নে নিজের বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি—উভয় স্থানেই নামে-বেনামে কিনেছেন বিঘায় বিঘায় জমি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সহকর্মীদের কাছেও এক আতঙ্কের নাম হারুন। অভিযোগ রয়েছে, অত্যন্ত সুরক্ষিত জায়গা সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য দর্শনার্থী পাশ তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে তিনি জনপ্রতি ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা করে আদায় করে থাকেন। ‘সচিবালয় পাশ বাণিজ্য’ করে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা কামিয়ে নিচ্ছে হারুন সিন্ডিকেট।
এ ছাড়াও মন্ত্রণালয়ে ভূমি সংক্রান্ত জটিল ফাইল সংশোধন বা দ্রুত নিষ্পত্তির নামে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন তিনি। ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে সরানো, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে বদলি, তদবির ও পদোন্নতির কথা বলে নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্বজন ও সহকর্মীদের ক্ষোভ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হারুনের এক নিকটাত্মীয় বলেন, ‘একজন সামান্য পিয়ন কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হয়? শুধু নগদ টাকাই তাঁর কাছে রয়েছে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ কোটি। গ্রামের বাড়িতে সবাই তাঁকে ‘কোটিপতি হারুন’ নামেই চেনে। অবৈধ আয়ের উৎস ঢাকতে স্ত্রী ও ঘনিষ্ঠ স্বজনদের নামে ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ টাকা গচ্ছিত রেখেছেন তিনি।’
মন্ত্রণালয়ের একাধিক সহকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, হারুন প্রশাসনিক ক্ষমতাকে জিম্মি করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করছেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা এবং ফাইল আটকে রেখে অনৈতিক সুবিধা আদায় করাই তাঁর মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদন্তের আশ্বাস
উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হারুন অর রশিদের মুঠোফোনে (০১৭৫৬...০০১) একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,‘হারুন অর রশিদের বিষয়ে কিছু অভিযোগ আমাদের মৌখিকভাবে গোচরীভূত হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬