সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় অপূর্ব (৩০) নামের এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে দুর্গাপুরের মধ্যবাজারের সিনেমা হল এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দেশে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর চলমান প্রাণঘাতী হামলার সর্বশেষ শিকার নেত্রকোণার আলিফ ফকির। এই হত্যাকাণ্ড আবারও সাংবাদিকতা পেশার চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে সামনে এনেছে।
হত্যাকাণ্ড ও আসামির চাঞ্চল্যকর অতীত
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া অপূর্ব দুর্গাপুর পৌরসভার উকিলপাড়া এলাকার মো. শমশেরের ছেলে। পেশায় তিনি একজন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির মেকানিক।
গত ১৫ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার তিলনজিয়া এলাকায় সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যার পর অস্ত্রধারী হামলাকারীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে লুকিয়ে আছে আরেক চাঞ্চল্যকর অপরাধের ইতিহাস।
দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, এর আগে আলিফ ফকিরকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপূর্বসহ কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছিল। সে সময় আলিফ ফকিরের মতো দেখতে এক পুলিশ সদস্যকে তারা ভুল করে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়।
ওই পুলিশ সদস্যকে হত্যা মামলার অন্যতম আসামিও এই অপূর্ব। মূলত সেই পুরোনো আক্রোশ এবং সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট সন্দেহের ভিত্তিতেই শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আলিফ ফকিরের এই নির্মম মৃত্যু বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশার ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকিরই একটি প্রতিচ্ছবি। প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল, দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর রোষানলের শিকার হয়ে অনেক সাংবাদিককে প্রাণ দিতে হচ্ছে, নয়তো মিথ্যা মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য এক চরম বৈরী পরিবেশ বিরাজ করছে। অতীতের মতো স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতা আজ চরম হুমকির মুখে।
‘মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ ফর ডেভেলপমেন্ট’ (মিড)-এর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের (২০২৬) জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১৬২ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন।
দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান আরও ভয়ংকর। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বাংলাদেশে ৬১ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। মামলা দিয়ে হয়রানির চিত্র তো আরও ভয়াবহ।
সম্প্রতি সাংবাদিক হাসান মেহেদী, তাহির জামান প্রিয় এবং আসাদুজ্জামান তুহিনকে নির্মমভাবে হত্যার পর ইউনেস্কো ও সিপিজে-এর মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সরকারের করণীয়
সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সাংবাদিক হত্যার অধিকাংশ মামলার বিচারকাজ বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। সাক্ষীর অভাবে আসামিরা পার পেয়ে যায়। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। সাংবাদিক আলিফ ফকিরসহ অতীতের সব সাংবাদিক হত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকতা পেশার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের প্রতি প্রধান দাবিগুলো হলো:
- দ্রুত বিচার ও দায়মুক্তি রোধ: বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা।
- নিরাপত্তা কাঠামো প্রণয়ন: সাংবাদিকদের সুরক্ষায় বিশেষ আইন প্রণয়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানী কাজের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রদান।
- হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার: প্রভাবশালীদের দায়ের করা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা থেকে সাংবাদিকদের দ্রুত অব্যাহতি দেওয়া।
গণমাধ্যমকর্মীরা যাতে নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন, তার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ১৮ অক্টোবর ২০২৬