দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের পুঞ্জীভূত সংকট কাটিয়ে উঠতে বিপুল পরিমাণ বিদেশি অর্থায়নের প্রয়োজন।  শুধু ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করে স্থিতিশীলতা ফেরাতেই অন্তত ৪০ বিলিয়ন ডলার দরকার বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু দাতা সংস্থাগুলোর ঋণ দিয়ে সাময়িক তারল্য জোগালে দীর্ঘমেয়াদি সুফল মিলবে না; এর জন্য অপরিহার্য অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংস্কার ও কঠোর জবাবদিহি।

ব্যাংক খাতের বর্তমান চিত্র রীতিমতো উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে বিতরণকৃত প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই খেলাপি। বিপুল এ খেলাপি ঋণের ভার সামলাতে গিয়ে তারল্য সংকটে পুরো ব্যাংকিং খাত এখন রীতিমতো ধুঁকছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংকট উত্তরণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। ব্যাংক ব্যবস্থায় যে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে উদ্ধার পেতে খুবই রক্ষণশীল হিসাব করলেও অন্তত ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।’

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের শর্ত মানতেও প্রস্তুত সরকার
তবে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা এবং এই বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের সঠিক ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসাইন সিদ্দিকী সতর্ক করে বলেন, ‘এত বিপুলসংখ্যক ব্যাংকের পেছনে যদি ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়, তবে প্রকৃতপক্ষে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর বদলে তা আবারও চরম নাজুক অবস্থায় পড়তে পারে।’

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ ব্যাংকগুলোর সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি খাতে এতগুলো ব্যাংকের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। এই মুহূর্তে সবগুলো ব্যাংক তড়িঘড়ি করে বেসরকারীকরণ হয়তো সম্ভব নয়, তবে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে ব্যাংকের সংখ্যা যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনা উচিত।’

অর্থনীতিবিদদের এমন উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার শুধু বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল না থেকে আর্থিক খাতে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের দিকেও জোর দিচ্ছে। 

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, ব্যাংক খাতের সংস্কারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইনগুলো পাস করা হচ্ছে। ব্যক্তিখাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে তিনি বলেন, "কোনো দেশের ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা কখনোই ৫ শতাংশ হতে পারে না। আমরা আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যক্তিখাতে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।"

বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে, ৪০ বিলিয়ন ডলারের এই অর্থায়ন সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির মেরুদণ্ড সোজা করতে পারবে না। টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য বিদেশি সহায়তার পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ২৪ অক্টোবর ২০২৬