➤ এইচএসসির ফল বিপর্যয়:

  • উচ্চশিক্ষায় ফাঁকা থাকবে প্রায় ৭ লাখ আসন, শিক্ষার্থী সংকটে পড়বে শত শত প্রতিষ্ঠান
  • ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল: শিক্ষার্থী পেতে ভর্তির যোগ্যতা শিথিলের পথে হাঁটবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো?
  • শিক্ষার্থীর চেয়ে আসন দ্বিগুণের বেশি: এইচএসসিতে পাসের হার কমায় চরম সংকটে বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

➤ চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফল বিপর্যয় ঘটেছে। পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে দেশের উচ্চশিক্ষা স্তরে। 

দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যত আসন রয়েছে, পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা তার অর্ধেকেরও কম। ফলে পাস করা সব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও এবার প্রায় ৭ লাখ আসন ফাঁকা পড়ে থাকবে। এ অবস্থায় চরম শিক্ষার্থী সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলো।

পরিসংখ্যানে পাসের হার ও আসন চিত্র 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো মিলিয়ে স্নাতক সম্মান ও পাস কোর্সে মোট আসন রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার। 

অথচ এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন। অর্থাৎ, শতভাগ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হলেও ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৩১৫টি আসন ফাঁকা থাকবে।

ইতিহাসে রেকর্ড ফল বিপর্যয়!
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৪ সালে এইচএসসিতে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর গত ২২ বছরে এমন বিপর্যয় আর দেখা যায়নি। গত বছর (২০২৫) এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬৯ হাজার ৯৭ জন। 

সে তুলনায় এবার পাসের হার ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৯ হাজার ১৩ জন কমেছে। এর আগে, ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যেখানে ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৩০৯ জন পাস করেছিল এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন।

চরম সংকটে পড়বে যেসব প্রতিষ্ঠান 

উচ্চশিক্ষার মোট ১৩ লাখ ৪০ হাজার আসনের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আসন রয়েছে ৯ লাখ ২১ হাজার। বাকি ৪ লাখ ১৯ হাজার আসন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে।

সাধারণত ভালো ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের প্রধান লক্ষ্য থাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে প্রায় ৬০ হাজারের মতো। এর বাইরে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (সরকারি সাত কলেজ), প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো কলেজগুলো মিলিয়ে আরও প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাবে। 

ফলে অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটে থাকা নামসর্বস্ব অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ কলেজগুলো এবার চরম শিক্ষার্থী খরায় ভুগবে।

বাবার বুকে মাথা রেখে কেঁদে ফেললেন মেয়ে...
ভর্তির যোগ্যতা শিথিলের সম্ভাবনা 

শিক্ষার্থী সংকটের এই বাস্তবতায় অনেক প্রতিষ্ঠানকেই এবার ভর্তির শর্ত শিথিল করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম বলেন, "এবার উচ্চশিক্ষায় অর্ধেকের বেশি আসন ফাঁকা থাকবে। ফলে শিক্ষার্থী পেতে হলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়কেই ভর্তিতে জিপিএর যে প্রাথমিক শর্ত থাকে, তা বাধ্য হয়েই শিথিল বা বাদ দিতে হবে।"

তবে শর্ত শিথিলের বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব এখতিয়ার বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার মানের (কোয়ালিটি) সঙ্গে কতটুকু আপস করে শিক্ষার্থী ভর্তি করাবে, এটা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তারা সেভাবেই চিন্তা-ভাবনা করবে। তবে পাস করা সব শিক্ষার্থীই যে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ পাবে, তা নিশ্চিত।"

সংকট থেকে উত্তরণের উপায় 

শিক্ষার্থী সংকটের এই হতাশাজনক চিত্রকে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখছেন অনেক শিক্ষাবিদ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, "আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ সক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এমন অনেক কলেজ আছে যারা ২০০-৩০০ শিক্ষার্থী ভর্তি নেয়, অথচ তাদের পর্যাপ্ত শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের বসার জায়গাটুকুও নেই। ফলে উচ্চশিক্ষায় মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।"

তিনি আরও বলেন, এই জোড়াতালির ধারা থেকে বের হওয়ার এখনই সময়। শিক্ষক ও অবকাঠামোর অনুপাত হিসাব করে একটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারবে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। সেই অনুযায়ী আসন সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করা হলে শিক্ষার মান যেমন বাড়বে, তেমনি তথাকথিত এই আসন ফাঁকা থাকার সংকটও যৌক্তিকভাবে সমাধান হবে। ◉

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০২ নভেম্বর ২০২৬