দেশে গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ৭৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার মধ্যে অন্তত ২৫৩ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের ১৫৪ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৭ জন, মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ৫৪ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে মারা গেছেন ৩৭ জন বন্দী।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) সোমবার (১২ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে। দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনের সংগৃহীত তথ্য ও তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্ষণের শিকার নারী ও কন্যাশিশুদের ৬১ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। তাদের মধ্যে ৪২ জন বা ১৭ শতাংশ দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর ১২ জনকে হত্যা করা হয়েছে এবং ধর্ষণের শিকার হয়ে একজন আত্মহত্যা করেছেন। এই ১৩ জনের মধ্যে পাঁচজন শিশু ও কিশোরী।
এ সময়ে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ২২০ জন নারী ও কন্যাশিশু। তার মধ্যে ১০৩ জন বা ৪৭ শতাংশ শিশু। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় ১৩ জন নারী নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছেন। আত্মহত্যা করেছেন দুইজন নারী।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিন মাসে ৭৩৩ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮৯ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ৫৪৪ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়ে এইচআরএসএস জানিয়েছে, তিন মাসে দলীয় কোন্দল ও বিভিন্ন দলের সংঘর্ষে নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছেন। মোট ১৮৩টি ঘটনায় ১৭ জন নিহত ও ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন।
নিহত ১৭ জনের মধ্যে বিএনপির নয়জন বা ৫৩ শতাংশ, জামায়াতের দুইজন, আওয়ামী লীগের তিনজন ও অন্যান্য দলের তিনজন।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দখলদারত্ব এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ সহিংসতা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন জেলায় আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব, নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সহিংসতা এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অন্তত ৫১টি ঘটনায় ১৫৩টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া সন্ত্রাস ও নাশকতা দমন, পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানে ৩৭ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরএসএস। সংগঠনটি বলেছে, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ নানা অভিযোগে তিন মাসে ১৩৭টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৫৪ জন নিহত ও ১৪৫ জন আহত হয়েছেন।
একই সময়ে অন্তত ৮৮টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৩৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৬৩ জন আহত, ২৭ জন লাঞ্ছিত ও ১৮ জন হুমকির শিকার হয়েছেন। আটক করা হয়েছে নয়জন সাংবাদিককে। এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইনের আওতায় চারটি মামলায় ১৮ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, তিন মাসে দেশের কারাগারগুলোতে অন্তত ৩৭ জন বন্দী মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১৪ জন কয়েদি ও ২৩ জন হাজতি। মৃতদের পাঁচজন আওয়ামী লীগের এবং ৩২ জন সাধারণ বন্দী ছিলেন।
একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন হেফাজতে এবং একজন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন মাসে অন্তত ছয়টি হামলায় ছয়জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় দুটি মন্দির, পাঁচটি প্রতিমা ও চারটি বসতবাড়িতে হামলা এবং ভাঙচুর হয়েছে।
নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে লাশ উদ্ধারের ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের ২৮৫টি ঘটনায় ৩০২টি লাশ উদ্ধার হয়েছে।
এর মধ্যে বস্তাবন্দী অবস্থায় ২৯টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ৬৭টি ও শরীরে একাধিক আঘাতসহ ৪৩টি লাশ পাওয়া গেছে। গলা কেটে হত্যার শিকার ১৯ জন এবং হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ১৯ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। অন্যান্য পরিস্থিতিতে আরও ১২৫টি লাশ পাওয়া গেছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন মাসে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে ১১টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় চারজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। তারা সবাই গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত বা নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন সীমান্ত থেকে ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় একজন নারীর লাশও পাওয়া গেছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণ, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র এবং সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
তিনি বলেন, বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা ও গণপিটুনি, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা এবং হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
মানবাধিকার রক্ষায় সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনকে আরও সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১২ অক্টোবর ২০২৬