ঢাকা: রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব রুখতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৫৪৫ জন সক্রিয় চাঁদাবাজের একটি নতুন তালিকা তৈরি করেছে সরকার। ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ে অভিযান চলছে বেশ ধীরগতিতে।
এর নেপথ্যে মূল কারণ দুটি—সুনির্দিষ্ট মামলার অভাব এবং তালিকাভুক্তদের একটি বড় অংশের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সংশ্লিষ্টতা। ফলে একদিকে যেমন আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক রোষানলের ভয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযান চালাতে দ্বিধায় ভুগছেন।
চাঁদাবাজদের পরিসংখ্যান ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর চাঁদাবাজ দমনে এটি দ্বিতীয় তালিকা। এর আগে ১ হাজার ২০০ জনের একটি তালিকা করা হয়েছিল। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন জানান, আগের তালিকা যাচাই-বাছাই ও মাঠপর্যায় থেকে নতুন তথ্য সংগ্রহের পর এই সর্বশেষ তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে।
সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর তেজগাঁও বিভাগে সর্বোচ্চ ১৫৫ জন সন্দেহভাজন চাঁদাবাজ রয়েছে। এছাড়া গুলশানে ৮৫, উত্তরায় ৭২, লালবাগে ৭১, মিরপুরে ৬৬, রমনায় ৫০, ওয়ারীতে ২৪ এবং মতিঝিলে ২২ জনের নাম রয়েছে।
গণমাধ্যমের হাতে আসা ২১৫ জনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর মধ্যে অন্তত ৭৫ জনই ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বা এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ১৩৪ জনের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। বাকি ৬ জনের মধ্যে দুজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং দুজন সাবেক পুলিশ সদস্য।

ডিএমপির মিডিয়া উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে ঠিক কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে পুলিশের কাছে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা না থাকায় অনেককে পুরোনো মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখাতে হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, গত ৫ অক্টোবর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মিজানুর রহমান স্বপনকে ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আটক করে শেরেবাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করে।
থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, এসআরবি কোনো নির্দিষ্ট মামলায় তাকে হস্তান্তর করেনি। বাধ্য হয়ে স্বপনকে এক চিকিৎসকের করা পুরোনো একটি চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ফলস্বরূপ পরদিনই তিনি আদালত থেকে জামিন পেয়ে যান।
একইভাবে, খিলক্ষেতের এক বিএনপি নেতাকে এসআরবি আটকের পর তেজগাঁও পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। সিদ্ধান্তহীনতার পর তাকে কারওয়ান বাজারের একটি চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলে তিনিও দুই দিনের মাথায় জামিনে বেরিয়ে আসেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “তালিকার ওপর ভিত্তি করে ধরলে কোন মামলায় গ্রেপ্তার দেখাব, সে বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। তাছাড়া দু-তিন দিনে যদি তারা জামিন পেয়েই যায়, তবে এভাবে তালিকা করে বা ধরে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।”

মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের বড় ভয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের প্রতিশোধ। তালিকাভুক্ত অনেক চাঁদাবাজের সঙ্গে বর্তমান সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
ডিবির এক উপকমিশনার জানান, সম্প্রতি এক মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন এক নেতার অবস্থান শনাক্ত করার পরও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা তাকে ধরতে গড়িমসি করেন। এই পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশের অনেক কর্মকর্তা এসআরবি বা সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে ‘যৌথ অভিযান’ পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন, যাতে এককভাবে পুলিশের ওপর রাজনৈতিক চাপ না পড়ে।
সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের কঠোর অবস্থান
পুলিশের এই দ্বিধার বিপরীতে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রত্যাশা পূরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বদ্ধপরিকর। যারা এই প্রতিশ্রুতি নষ্ট করতে চায়—সে আমাদের দলের হোক বা বাইরের—প্রশাসনের উচিত কাউকে ছাড় না দেওয়া।”
তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেখানে অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই একজন ক্ষমতাসীন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন, এমনকি ছাত্রদল ও যুবদলসহ দলের মহানগর ইউনিটের কমিটি বিলুপ্ত করেছেন; সেই উদাহরণের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য আর কোনো বার্তা বাকি থাকে না।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদও আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, যৌথ অভিযান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় কোনো অপরাধীর ঢাল হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আইন অনুযায়ীই পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নেবে।”
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ২১ অক্টোবর ২০২৬