দেশে প্রতিবছর গড়ে ২০ লাখ সম্ভাবনাময় মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে মাত্র ৯ লাখের। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি কর্মক্ষম মানুষ বেকার থেকে যাচ্ছেন অথবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
আর যেটুকু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তার ১০টির মধ্যে প্রায় ৭টিই তৈরি হচ্ছে কৃষিক্ষেত্রে; বিপরীতে উৎপাদনশীল শিল্প খাতে কর্মী বৃদ্ধি না পেয়ে উল্টো সংকুচিত হচ্ছে। গত এক দশকে দেশে গড়ে ৬ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি, যাকে ‘উৎপাদনশীলতার বৈপরীত্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ ২০২৬’-এর বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি। উল্টো বিক্রি, রপ্তানি ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা ক্রমে গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে পড়েছে।
অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের মুঠোয় অর্থনীতি, চাকরিতে পিছিয়ে
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উৎপাদনশীলতায় শীর্ষে থাকা ১০ শতাংশ ‘ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠান’ বর্তমানে মোট আনুষ্ঠানিক খাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ বিক্রি এবং ৬৯ শতাংশ রপ্তানি আয় নিয়ন্ত্রণ করছে। ১০ বছর আগে রপ্তানিতে এদের অংশ ছিল মাত্র ৩৭ শতাংশ। অথচ এত বিপুল বিক্রির বিপরীতে মোট মেধা ও কর্মসংস্থানে এসব বড় প্রতিষ্ঠানের অংশ মাত্র ১৫ শতাংশ।
বাকি ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান যে নন-ফ্রন্টিয়ার বা ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে হচ্ছে, সেগুলোর বিনিয়োগ, প্রযুক্তি গ্রহণ ও বিশ্ববাজারে প্রবেশের সুযোগ চরমভাবে সীমিত। এমনকি তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো মোট বিক্রির অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করলেও বেসরকারি আনুষ্ঠানিক খাতের প্রতি ১২টি চাকরির মাত্র ১টি আসছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে।
নারী কর্মসংস্থানে বড় ধস
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিল্প ও সেবা খাতে নারী কর্মসংস্থানে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে। আলোচিত সময়ে শিল্পে ১১ লাখ এবং সেবা খাতে ৮ লাখ নারী কর্মী কাজ হারিয়েছেন। বাধ্য হয়ে ৪২ লাখ নারী তুলনামূলক কম আয়ের কৃষিখাতে যুক্ত হয়েছেন।
ফলে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার গড় মানদণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশের সেবা ও উৎপাদন খাতের কর্মীপ্রতি আয় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নিম্ন উৎপাদনশীলতাকেই স্পষ্ট করে।

নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠা ও বড় হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত ঘাটতি। সরকারি নিয়মনীতি সামলাতেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপকদের কাজের গড়ে ১৩ শতাংশ সময় অপচয় হয়, যা চট্টগ্রামে ৪০ শতাংশ এবং বরিশালে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। দেশে একটি পরিচালনা বা নির্মাণ অনুমোদন পেতেই গড়ে ৪৯ দিন সময় লাগে, যা চীন বা ভারতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চরম বিদ্যুৎ সংকট। দেশের ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়ে। মাসে গড়ে ২৬ বার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ব্যবসায়ীদের বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ পেতেও অপেক্ষা করতে হয় গড়ে ৮৯ দিন।
কর ও ঋণে চরম নীতিগত বৈষম্য
দেশের রাজস্ব ও বাণিজ্যনীতিতে ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। সাধারণ প্রতিষ্ঠানের জন্য করপোরেট করের হার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও পোশাক খাত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কর ছাড় পাচ্ছে। কেবল ২০২১ সালেই এ ধরনের করছাড়ের কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
একইভাবে শুল্কমুক্ত বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা এবং নিম্ন সুদের রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) ৯০ শতাংশের বেশি সুবিধা এককভাবে পোশাক খাত ভোগ করছে। এতে অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাত বিকাশ লাভ করতে পারছে না। অন্যদিকে, মোট ৩০ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণ বা অর্থায়ন সুবিধা থেকে পুরোপুরি বা আংশিক বঞ্চিত।
অনানুষ্ঠানিক খাতের সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়
বাংলাদেশে প্রায় ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ছোট আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের সমান উৎপাদনশীল হওয়া সত্ত্বেও বাড়তি করের বোঝা (৭১%), আমলাতান্ত্রিক পরিদর্শন (৬১%) এবং জটিল নিবন্ধনের (৭৩%) ভয়ে অনানুষ্ঠানিক রয়ে যাচ্ছে।
এই স্থবিরতা ভাঙতে বিশ্বব্যাংক ‘স্মার্ট ডিরেগুলেশন’ বা বুদ্ধিদীপ্তভাবে সরকারি নিয়মকানুন সহজ করার তাগিদ দিয়েছে। একই সঙ্গে সারা দেশে লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটালকরণ, বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিতে পৃথক ব্যবস্থা, কর ছাড় ও কম সুদের ঋণে স্বচ্ছতা আনা এবং ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) সঙ্গে যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গুটিকয়েক খাতকে অহেতুক সুরক্ষা না দিয়ে সার্বিক পরিবেশ প্রতিযোগিতামূলক করতে পারলেই কেবল প্রবৃদ্ধির সুফল কর্মসংস্থানে রূপ নেবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬