মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল

  •  সবচেয়ে বেশি প্রাণ কেড়েছে অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস
  • ৬ বছর ১০ মাসে ৩ হাজার ৪০০ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি
  • একসঙ্গে বের হয়ে আর বাড়ি ফেরেনি অনেকে

➤ খুশির ভ্রমণে বা প্রয়োজনে একসঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরা হয়নি তাদের। একটি দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাণই কাড়ছে না, বরং এক নিমিষেই মুছে দিচ্ছে পুরো পরিবারের অস্তিত্ব। 

গত ৬ বছর ১০ মাসে (২০২০ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত) দেশের সড়কগুলোতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে প্রায় ৩০০ পরিবার। এই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের অন্তত ৩ হাজার ৪০০ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

রোববার (৮ নভেম্বর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত এক শিউরে ওঠা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং সংগঠনের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

শীর্ষ ঘাতক অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস 

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হওয়ার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে তিন চাকার অটোরিকশা দুর্ঘটনায়। মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গত প্রায় ৭ বছরে ৫২৫টি অটোরিকশা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৭২৮ জন।

এর মধ্যে একই পরিবারের দুজন নিহত হওয়ার ঘটনা ২১১টি, তিনজন ১১৮টি, চারজন ৯২টি, পাঁচজন ৫৩টি, ছয়জন ৩৮টি এবং সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত নিহত হওয়ার ১৩টি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।

মাইক্রোবাসের চিত্রটিও চরম উদ্বেগজনক। গত ৬ বছর ১০ মাসে ১৮৬টি মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ৭০৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় দুজন নিহত হওয়ার ঘটনা ৪৮টি, তিনজন ৪৬টি, চারজন ৩৯টি এবং পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে ২৮টি ঘটনায়। 

এমনকি একটি মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় একই পরিবারের সর্বোচ্চ ১৪ জন নিহত হওয়ার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া ১১ জন নিহত হওয়ার ৪টি এবং ৬ জন নিহত হওয়ার ২০টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

সড়কের বিষফোঁড়া এই ব্যাটারি রিকশা ...
প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যান

 প্রাইভেটকার দুর্ঘটনায় ১০৮টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের ৩৫২ জন (দুজন ৩৪টি, তিনজন ৩১টি, চারজন ২৪টি এবং পাঁচজন ১৯টি)।

অপরদিকে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী ও বাবা-সন্তানের একসঙ্গে মৃত্যুর হার মারাত্মকভাবে বেড়েছে। ১৯৩টি বাইক দুর্ঘটনায় ৩৮৬ জন স্বামী-স্ত্রী এবং ১৫৯টি দুর্ঘটনায় ৩১৮ জন বাবা-সন্তান নিহত হয়েছেন।

জরুরি সেবার অ্যাম্বুলেন্সও অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। ৪৫টি অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনায় ১৬২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যেখানে এক পরিবারের সর্বোচ্চ আটজন পর্যন্ত নিহত হওয়ার তিনটি ঘটনা রয়েছে (এছাড়া দুজন ১১টি, তিনজন ১৫টি, চারজন ৯টি ও পাঁচজন নিহত হওয়ার ৭টি ঘটনা)। 

বাস দুর্ঘটনায় ৩২টি ঘটনায় ৮৫ জন (দুজন ১৭টি, তিনজন ৯টি ও চারজন ৬টি) এবং পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণ ও ঝুঁকি 

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, পরিবারের সদস্যরা সাধারণত একসঙ্গে ভ্রমণ বা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যান, যার ফলে একটি বড় দুর্ঘটনা পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মহাসড়কে অবৈধভাবে অটোরিকশা চলাচল এই মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

এছাড়া অধিকাংশ মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস না থাকা, চালকদের অদক্ষতা, বিশ্রামহীনভাবে গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। বাইক আরোহীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা এবং বেপরোয়া গতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

উত্তরণের উপায় ও সুপারিশ 

সড়কে কাঠামোগত এই হত্যাযজ্ঞ থামাতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে রয়েছে:

  • মহাসড়কে রোড ডিভাইডার ও সার্ভিস রোড নির্মাণ।
  • গ্রামীণ সড়ক থেকে মহাসড়কে সরাসরি যান চলাচল বন্ধে নিরাপদ সড়ক নকশা প্রণয়ন।
  • যানবাহন চলাচলে কঠোর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ।
  • মোটরসাইকেল আরোহীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা।
  • সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
  • সড়ক ব্যবহারকারীদের সক্ষমতা ও সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষামূলক কার্যক্রম জোরদার করা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কাঠামোগত উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া সড়কে পরিবারের পর পরিবার নিশ্চিহ্ন হওয়ার এই মর্মান্তিক মিছিল থামানো অসম্ভব। ◉ 

নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০৮ নভেম্বর ২০২৬