সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলা এখন রিয়াদের সঙ্গে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের যৌথ নিরাপত্তার প্রশ্ন! মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে তুরস্ক–পাকিস্তানের দ্রুত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বকে বাস্তবে নামাচ্ছে। এর তাৎক্ষণিক গুরুত্ব সৌদির সুরক্ষা জোরদার করার অঙ্গীকার। আর বৃহত্তর প্রভাব হুতিদের সামরিক হিসাব এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রিয়াদে তিন দেশের কৌশলগত–রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির জরুরি বৈঠকে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং সৌদিতে দ্রুত সামরিক শক্তি মোতায়েনের ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। যৌথ বিবৃতিতে মক্কা–মদিনায় হামলার চেষ্টা এবং সৌদির বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা করা হয়েছে। তবে নতুন মোতায়েনের সেনাসংখ্যা, সময়সূচি ও নির্দিষ্ট দায়িত্ব জানানো হয়নি।
গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত চুক্তিতে কোনো সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা রয়েছে। তবে ৫ অক্টোবরের ঘোষণায় মোতায়েনের স্থান সৌদি আরব এবং বাস্তবায়নের ভিত্তি অনুমোদিত ব্যবস্থা ও সদস্যদের জাতীয় আইন। ফলে সৌদির প্রতিরক্ষা জোরদার করা এবং ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি যুদ্ধ চালানোর সিদ্ধান্তকে আলাদাভাবে দেখতে হবে।
আঞ্চলিক পরিবর্তনের প্রথম দিকটি নিরাপত্তা অংশীদারের বিস্তার। রয়টার্সের ১৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সহায়তার সৌদি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক–পাকিস্তানের অঙ্গীকার রিয়াদকে নতুন বিকল্প দিচ্ছে। তবে পাকিস্তান জানিয়েছে, মক্কা চুক্তি বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি প্রতিস্থাপন করে না।
এর প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল আগেই। ২৫ সেপ্টেম্বর তিন দেশের সামরিক প্রধানেরা গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয় এবং সক্ষমতার সমন্বিত ব্যবহার বাড়ানোর বিষয় আলোচনা করেন। ৩১ আগস্টের যৌথ বিবৃতিতে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উৎপাদনের কথাও ছিল। অর্থাৎ এই জোটের লক্ষ্য সামরিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ও সমন্বয়ের ভিত্তি গড়া।

এই তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন হলো, সৌদির শহর, তেল স্থাপনা ও সীমান্তের সুরক্ষা বাড়ানোর সুযোগ। হামলা শনাক্ত ও প্রতিহত করার সক্ষমতা বাড়লে রিয়াদ প্রতিরক্ষায় সুবিধা পেতে পারে। একই সঙ্গে সৌদিসমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর অভিযানে সহায়তার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে তার মাত্রা নির্ভর করবে মোতায়েনকৃত সরঞ্জাম, সমন্বয় এবং বাস্তবে সেগুলোর কার্যকারিতার ওপর।
ইয়েমেনে ইতোমধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। রয়টার্সের ৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে সৌদিসমর্থিত সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দাবের কাছে উপকূলীয় এলাকায় অগ্রগতির দাবি করে। পাল্টা হুতিরা সৌদির বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি জানায়। রয়টার্স এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তাই যুদ্ধক্ষেত্রের ঘোষিত অগ্রগতিকে নতুন জোটের নিশ্চিত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
হুতিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক ফল অর্জনের বাধাও রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষক এজাজ হায়দার এক নিবন্ধে ইয়েমেনের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, প্রতিরক্ষায় সুবিধাজনক অবস্থান এবং আক্রমণকারী বাহিনীর রসদ সরবরাহের জটিলতা তুলে ধরেছেন। তার মূল্যায়নে, স্থলাভিযান কিংবা দূরপাল্লার হামলা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। ফলে সৌদির প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হলেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের নিষ্পত্তি আলাদা চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে ইরানের জন্য নতুন জোটের সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের সঙ্গে তার সম্পর্ক সৌদির দক্ষিণ সীমান্ত ও লোহিত সাগরে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়। নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কার্যকরভাবে হামলা ঠেকাতে পারলে সেই চাপ প্রয়োগের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে সৌদির ওপর নতুন হামলার ক্ষেত্রে তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় আসবে। তবে এই পরিবর্তনকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য বলা যায় না।
এর পাশাপাশি আলোচনার একটি পথও রয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ২ অক্টোবর জানান, ইরান হুতিদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দার একে লিখিত বা চূড়ান্ত প্রস্তাব হিসেবে বর্ণনা করেননি; দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনায় আসা সদিচ্ছাপূর্ণ ধারণা বলেছেন। তিনি তেহরানকে মক্কা চুক্তি এবং পাকিস্তানের অঙ্গীকার পালনের অবস্থানও জানিয়েছেন। ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ পাশাপাশি চলছে।
রিয়াদের বৈঠকের পর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও জানান, সৌদিকে কী সহায়তা দেওয়া যায় এবং সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান কীভাবে সম্ভব, দুটোই আলোচনা হয়েছে। এই অবস্থানের সম্ভাব্য তাৎপর্য হলো, আঙ্কারা–ইসলামাবাদ রিয়াদের প্রতিরক্ষা অংশীদার হয়েও আলোচনার উদ্যোগে ভূমিকা রাখতে পারে। ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ ব্যবহার করে উত্তেজনা কমানো তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সংকটের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পৌঁছায়। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব খালেদ খিয়ারি সম্প্রতি সতর্ক করেন, হরমুজে চলমান বিঘ্নের মধ্যে বাব আল-মান্দাবের দিকে হুতিদের অগ্রগতি বাজারের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতের পটভূমিতে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা তাই জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রশ্ন। এই পথে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পরিবহন, সরবরাহ ও ব্যবসার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ইয়েমেনের যুদ্ধ তাই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে।
মক্কা চুক্তির বাস্তবায়ন তাই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় নতুন অংশীদারত্বের সূচনা জোরালো করছে। সামরিকভাবে এর ফল নির্ভর করবে হামলা প্রতিহত করা, সমন্বয় এবং দায়িত্বের ওপর; রাজনৈতিকভাবে এটি সৌদির পক্ষে যৌথ অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। ইরান ও হুতিদের সামনে নতুন হিসাব তৈরি হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের সঙ্গে কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের পথও প্রয়োজন।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬