প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি নম্বর ও সিলেবাসের চাপে পড়াশোনা করছে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। শ্রেণিভেদে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে এই ব্যবধান ১০০ থেকে ৪০০ নম্বর পর্যন্ত।
ধর্মীয় শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা এবং উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্যেই মাদ্রাসার সিলেবাসে এই অতিরিক্ত বিষয় ও নম্বর যুক্ত করা হয়েছে।
তবে অতিরিক্ত পাঠ্যভার শিক্ষার্থীদের মনে বাড়তি চাপ তৈরি করায় এবং ঝরে পড়ার হার বাড়ায় নম্বর কমানোর সম্ভাবনার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করছে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড।
শ্রেণিভেদে নম্বর ও সিলেবাসের ব্যবধান
মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাস বিশ্লেෂণে দেখা যায়, প্রাথমিক স্তর থেকেই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত নম্বরের চাপ রয়েছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি: মাদ্রাসায় ৬ বিষয়ে মোট ৬০০ নম্বর (কুরআন মাজিদ ও তাজবিদ, আকাইদ ও ফিকহ, আরবিতে ৩০০ এবং বাংলা, ইংরেজি, গণিতে ৩০০), যেখানে সাধারণ শিক্ষায় ৭ বিষয়ে মোট নম্বর ৫০০।
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি: বিষয় ৮টি হলেও সাধারণে ৭০০ নম্বর এবং মাদ্রাসায় ১০০ নম্বর বেশি অর্থাৎ ৮০০ নম্বর রয়েছে।
পঞ্চম শ্রেণি: সাধারণে ৮ বিষয়ে ৭ নম্বর হলেও মাদ্রাসায় ৯ বিষয়ে ৯০০ নম্বর (আরবি প্রথম ও দ্বিতীয়পত্রসহ অতিরিক্ত ৪০০ নম্বর) পড়তে হয়।
ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি: সাধারণ শিক্ষায় ১০ বিষয়ে ৮০০ নম্বর এবং মাদ্রাসায় ১৩ বিষয়ে ১১০০ নম্বরে পড়াশোনা করতে হয় (৩০০ নম্বর বেশি)।
নবম-দশম শ্রেণি (সাধারণ/মানবিক ও বিজ্ঞান): সাধারণের মানবিক ও বিজ্ঞানে ১২৫০ নম্বর থাকলেও মাদ্রাসার সাধারণ বিভাগে ১৩৫০ এবং বিজ্ঞান বিভাগে ১৪০০ নম্বর নির্ধারিত রয়েছে।
উচ্চ মাধ্যমিক স্তর (আলিম বনাম এইচএসসি): সাধারণের মানবিক ও বিজ্ঞান শাখায় ১৩০০ নম্বর থাকলেও আলিমের সাধারণ বিভাগে ১৫০০ (২০০ নম্বর বেশি) এবং বিজ্ঞান বিভাগে ১৭০০ নম্বর (৪০০ নম্বর বেশি) অধ্যয়ন করতে হয়।
উচ্চশিক্ষার প্রতিবন্ধকতা ও পরিবর্তনের পটভূমি
২০১৫ সালের আগের পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য শর্তগত ও কাঠামোগত বাধা ছিল। বাংলা ও ইংরেজিতে ২০০ নম্বরের বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে তারা সুযোগ পেতেন না।
এই বৈষম্য দূর করতে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ২০১৩ সালে দাখিল ও আলিমে বাংলা ও ইংরেজিতে ২০০ নম্বর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বুয়েট, মেডিকেলসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনসহ ১২টি বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে।
শিক্ষাবিদ ও বোর্ডের মতামত
অতিরিক্ত নম্বরের চাপ ও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার বিষয়ে তা’মীরুল মিল্লাত মহিলা কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমান জানান, “বেশি নম্বরে পাঠদানের ফলে শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত চাপে রয়েছে। ধর্মীয় মূল বিষয়গুলো রেখে বাংলা ও ইংরেজির মতো সাধারণ বিষয়গুলোর নম্বর কমানো যেতে পারে।”
তবে ভিন্ন মত পোষণ করে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, “প্রতিযোগিতার বাজারে টিকতে হলে জেনারেল ও ধর্মীয়—উভয় বিষয়ের নম্বরই প্রয়োজন। আলিয়া মাদ্রাসার সিলেবাস সময়োপযোগী হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বুয়েট-মেডিকেলেও সফল হচ্ছে। তবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেওয়ার বিকল্প নেই।”
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, “অতীতে ঢাবিতে ভর্তিতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ওপর বৈষম্যমূলক শর্ত ছিল। মেধার ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করতে এই কাঠামোগত বাধা পুরোপুরি দূর করা উচিত।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম মনে করেন, অতিরিক্ত চাপ সত্ত্বেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা চ্যালেঞ্জ জয় করছে, তবে ভর্তি প্রক্রিয়া আরও বৈষম্যহীন হওয়া দরকার। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন সিলেবাস পুনর্বিন্যাসের জন্য গবেষণালব্ধ পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
সার্বিক পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড কনটেন্ট অপরিবর্তিত রেখে কেবল নম্বর কমানোর (যেমন ১০০ নম্বরের বিষয়কে ৭০ নম্বরে রূপান্তর) প্রাথমিক চিন্তা করলেও তা সংশ্লিষ্ট স্কলার ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে।
নিউজ নাউ বাংলা/ জেডআরসি/ ১৪ অক্টোবর ২০২৬